
স্বপ্ন ছিল প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবেন, ঘুচিয়ে দেবেন অভাবের তাড়না। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আজ চুরমার। দুই পা হারিয়ে এখন বিছানায় শয্যাশায়ী কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার সতরদ্রোন গ্রামের মো. নুরুল ইসলাম (৪৫)। চিকিৎসা ও জীবিকার চরম সংকটে আজ তার বাঁচার লড়াই থমকে যাওয়ার উপক্রম।
জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে শেষ সম্বল জমি-জমা বিক্রি করে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন নুরুল ইসলাম। সেখানে সফল হতে না পেরে ফিরে আসেন দেশে। দমে না গিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় পুনরায় পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। কিন্তু সেখানে কাজ শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই তার পায়ে ধরা পড়ে ভয়াবহ পচন রোগ। কর্মস্থলের কোম্পানি কোনো প্রকার আর্থিক সহায়তা না দিয়ে তাকে অসুস্থ অবস্থায় দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।
দেশে ফেরার পর শুরু হয় আরও করুণ অধ্যায়। রোগ সারাতে একের পর এক অস্ত্রোপচার করতে হয় তার শরীরে। প্রথমে তার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হয়, পরে সংক্রমণ বাড়লে তা হাঁটুর ওপর পর্যন্ত অপসারণ করা হয়। একইভাবে বাম পায়েও পচন ছড়িয়ে পড়ে। ধাপে ধাপে আঙুল এবং হাঁটুর নিচ পর্যন্ত কাটার পর শেষমেশ বাম পা-টিও হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়।
বর্তমানে তার বাম পায়ে আবারও নতুন করে পচন দেখা দিয়েছে, যার জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু চিকিৎসার খরচ জোগানোর মতো সামর্থ্য এখন আর তার নেই। অসুস্থ হওয়ার পর নুরুল ইসলামের জীবনে নেমে আসে আরও এক বড় আঘাত। দুর্দিনে পাশে থাকার বদলে তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। তার কোনো ভাই-বোন নেই। বাবা মো. নেন্দু মিয়া মারা গেছেন বহু আগে। বর্তমানে বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধ মা হাজেরা খাতুন। কিন্তু ভাগ্য এমনই বিড়ম্বিত যে, মা নিজেও গত এক বছর ধরে প্যারালাইসড হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। সেবা করা তো দূরে থাক, নিজের নড়াচড়ার ক্ষমতাও নেই তার।
নিজের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, "আমি বাঁচতে চাই। আমার চিকিৎসার জন্য সরকারের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের সবার সহযোগিতা চাই। আমি খুবই অসহায়; আমার বাবা নেই, ভাই-বোনও নেই। আমার মা প্যারালাইসড হয়ে এক বছর ধরে ঘরে শুয়ে আছেন। আগে একটি ছোট দোকান চালিয়ে কোনোভাবে আমাদের সংসার চলত, কিন্তু এখন আমি চলাফেরা করতে পারি না। আমি সবার কাছে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছি।"
নুরুল ইসলামের মা হাজেরা খাতুন নিজেও দীর্ঘ এক বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। নিজের অসুস্থতার চেয়ে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার দুশ্চিন্তা বেশি। তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, "আমার একমাত্র ছেলেও আজ গুরুতর অসুস্থ। আমি নিজেও শয্যাশায়ী। আমাদের চলার আর কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই। সমাজের বিত্তবানরা যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তবেই হয়তো আমরা এই যাত্রা বেঁচে ফিরতে পারব।"
সাবেক ইউপি সদস্য মো. বিরাজ মিয়া জানান, নুরুল ইসলামের দুই পা উরুর ওপর পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়েছে। "শুরুতে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে তার চিকিৎসার খরচ জোগালেও বর্তমানে তাকে দেখভাল করার মতো কেউ নেই। তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো নিকটাত্মীয়ও নেই। যদি সরকারিভাবে এবং প্রবাসীসহ সকল সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে আসেন, তবেই তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে।"
প্রতিবেশী রাকিব আহম্মেদ বলেন, "যখন নুরুল ইসলামের পায়ে পচন রোগ (গ্যাংরিন) দেখা দেয়, তখন তার স্ত্রী তাকে ফেলে রেখে চলে যান। বর্তমানে এই সংসারে দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই। মা নিজেও প্যারালাইসড হওয়ায় ছেলের সেবা করতে পারছেন না। তারা এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।"
এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন। নুরুল ইসলামের এই মানবিক পরিস্থিতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারি বিধি মোতাবেক তাকে প্রয়োজনীয় সকল সহায়তা প্রদানের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।