

নারায়ণগঞ্জে একের পর গ্যাস বিস্ফোরণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানি। পুলিশের তথ্য মতে, গত তিন বছরে এ জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮২ জন। তবে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি সে তালিকায়। বেশির ভাগ ঘটনা তিতাসের পাইপ লিকেজ ও সিলিন্ডার থেকে হলেও তা নিবারণের কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। ঘটনার পর থানায় অপমৃত্যুর মামলা হলেও জোরালো তদন্ত না হওয়ায় দোষীদের শনাক্ত করা যায় না। ফতুল্লার তল্লার মসজিদে গ্যাস বিস্ফোরণে ৩৭ জন নিহতের ঘটনা আজো ভুলতে পারেননি স্বজনরা। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও অনেকে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, ২০২২ সালের ১০৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তার মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৬৯টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরণ ঘটেছে ৩৪টি। এসব ঘটনায় নারী-শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছে ১৮ জন। দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। ২০২১ সালে ১১৪টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তার মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৯৬টি। রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরণ ঘটেছে ১৮টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জন। দগ্ধ হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। ২০২০ সালে ১০৬টি গ্যাস বিস্ফোরণের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে তিতাসের লাইনের ত্রুটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে ৭১টি। রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার, বয়লার ও এসি বিস্ফোরণ ঘটেছে ৪১টি। এসব ঘটনায় ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ২৬ জনকে। এর মধ্যে তল্লায় মসজিদে এক বিস্ফোরণেই মৃত্যু হয় ৩৭ জনের।
এসব তথ্য পুলিশ ফায়ার সার্ভিসের তালিকায় থাকলেও দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া অনেকের তথ্য তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, বাসাবাড়িতে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ তৎপরতা হলেও কয়েক দিনের মধ্যে এর অবসান ঘটে। গ্যাসের পাইপ লিকেজের বিষয়ে অভিযোগ দিলেও সমাধান না হওয়ায় ঘটনা ঘটছেই চলছে। তবে ফায়ার সার্ভিস বলছে- স্থানীয়দের অসচেতনতা ও তিতাস কর্তৃপক্ষের অবহেলা অনেক ঘটনার কারণ। এ জন্য গ্রাহকদের যেমন সচেতন থাকতে হবে তেমনি সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাসাবাড়িতে দরজা-জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায় গ্যাস পাইপের লিকেজ থেকে রুমে গ্যাস জমলেই বিপদ।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক ফখরুল উদ্দিন বলেন, অনেক সময় চুলা বা সিলিন্ডার থেকে গ্যাস লিক হলেও গ্রাহক তা জানে না। একটি ঘর চার-পাঁচ দিন বদ্ধ অবস্থায় থাকলে গ্যাস লিক হয়ে জমতে থাকে। ঘরের মানুষ তা বুঝতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে দুর্ঘটনার খবর আসা পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যায়। এ ব্যাপারে সবাইকে অধিক সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশীদ বলেন, বিতরণ লাইনের দায়িত্ব তাদের। কিন্তু বাসার ভেতরের হাউজ লাইনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের। এখন বেশির ভাগ দুর্ঘটনা হয় বাসার হাউজ লাইন থেকে। দেখা যায়, অনেকে যথাযথভাবে চুলা বন্ধ করেন না। তাতে গ্যাস লিকেজ হয়। পরে দেখা যায় চুলা জ্বালাতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের সচেতন থাকতে হবে। গ্যাস না থাকলে চুলার চাবি খোলা যাবে না এবং সব সময় সতর্ক রাখতে হবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) চাইলাউ মারমা বলেন, তারা অভিযোগ সাপেক্ষে বিভিন্ন মামলা নিয়ে তদন্ত করে চার্জশিটে সংশ্লিষ্টদের নাম উল্লেখসহ তা আদালতে দাখিল করেন। গ্যাস বিস্ফোরণ রোধে সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি নারায়ণগঞ্জবাসীর।


