/////

সিলেটে উপপরিচালক বরখাস্ত, ৮জনের নিয়োগ বাতিল

38 mins read

সিলেটের পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক লুৎফুন্নাহার জেসমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

‘পরিবার কল্যাণ সহকারী’ পদে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক লুৎফুন্নাহার জেসমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ সাময়িক বরখাস্ত করার পাশাপাশি তাঁর বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সিলেটের জেলা প্রশাসক তথা নিয়োগ কমিটির সভাপতিকে জেসমিনের করা নিয়োগ ও বাছাই কমিটির সুপারিশ বহির্ভূত ভাবে নিয়োগ করা ৮জনের নিয়োগপত্র বাতিলের ব্যবস্থা গ্রহণ ও এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় জেসমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিবারকল্যাণ সহকারী পদে ৮জনকে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তাঁদের নিয়োগ আদেশ বাতিলের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেয়ে একই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালকের (পরিবার পরিকল্পনা) কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিবারকল্যাণ সহকারী ছাড়া আয়া পদে নিয়োগেও নানা অনিয়ম বেরিয়ে আসছে। তদন্ত কমিটি টানা তিন দিন সিলেটে অবস্থান করে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করেছে।

এর আগে ২৭ মার্চ “সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়: পরীক্ষায় পাস না করেও নিয়োগ’ ৮ সহ বিভিন্ন শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়। এরপর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বুধবার ‘পাস ৫১, নিয়োগ ৫৮’ শিরোনামে সহ বিভিন্ন পত্রিকার প্রিন্ট সংস্করণে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ থেকে জানা গেছে, জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সিলেটের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জেসমিনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়ায় তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার তাঁকে বরখাস্তের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, জেসমিনের বিরুদ্ধে আনা জেলা পর্যায়ের নিয়োগে এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনি ভাবে এবং দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে জেলা নিয়োগ ও বাছাই কমিটির সুপারিশ বহির্ভূত ৮ জনের অনুকূলে নিয়োগপত্র জারি সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। বিভাগীয় মামলা তদন্তের স্বার্থে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন এই প্রজ্ঞাপন জারি করেন।

এ ছাড়া জেসমিনের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শৃঙ্খলামূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সিলেটের জেলা প্রশাসক তথা নিয়োগ কমিটির সভাপতিকে জনবল নিয়োগ ও বাছাই কমিটির সুপারিশ বহির্ভূত ভাবে নিয়োগ করা ৮ব্যক্তির নিয়োগপত্র বাতিলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও বর্ণিত কর্মকর্তাসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

জেসমিনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তদন্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেন বিদেশে পলায়ন করতে না পারেন-এ জন্য তাঁর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারির নির্দেশ দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগকে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন পৃথক তিনটি আদেশে এসব নির্দেশনা দেন।

সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়টি নজরে আসার পর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. মাহবুব আলম, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কেন্দ্রীয় পণ্যাগারের (ড্রাগস অ্যান্ড স্টোরস) অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুল বাতেন ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রশাসন ইউনিট সহকারী পরিচালক (পারা-১) মো. আব্দুল মান্নানকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পায়। এরপর পরই ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জেসমিনকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এ ছাড়া প্রাথমিক তদন্তে অনেকেরই নাম উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সিলেট সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবুল মনসুর আসজাদ বাদী হয়ে ওই ৮ জনের বিরুদ্ধে নগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. কুতুব উদ্দিন জানান, ‘যুগ্ম সচিব মো. মাহবুব আলমের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি সিলেটে অবস্থান করে বিভাগীয় পরিচালকের সভাকক্ষে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা অফিসেও গিয়েছেন। তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ায় আজ বুধবার রাতে তাঁদের সিলেট ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রুজি বেগম ও রমা রানী মিস্ত্রী নামে আরও দুই পরিবার কল্যাণ সহকারীকে বিজ্ঞপ্তি বহির্ভূত ইউনিটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সুরমার সিলাম ২ /ক ইউনিটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি, তবে চূড়ান্ত ফলাফলে আছেন এমন প্রার্থী রুজি বেগমকে জালালপুর ইউনিয়নে ২ /ক ইউনিটে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর রমা রানী বিশ্বনাথের রামপাশা ইউনিট থেকে নির্বাচিত হলেও অভিযোগ রয়েছে তিনি ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন।

অপরদিকে, আঞ্চলিক পণ্যাগারে সংযুক্ত পরিবার পরিকল্পনা সহকারী মো. মনসুর আহমেদের প্রচেষ্টায় আয়া পদে বিভিন্ন সময়ে তাঁর তিন আত্মীয় নিয়োগ পান। এর মধ্যে দক্ষিণ সুরমার কুচাই ইউনিয়নে তাছলিমা নাছরিন, নাসিমা বেগম গোয়াইনঘাটের নন্দিরগাঁওয়ে ও আছমা বেগম বিশ্বনাথের লামাকাজি ইউনিয়নে এ পদে নিয়োগ পান। তাঁদের তিনজনের ঠিকানা হিসেবে সিলেট নগরীর ৫৫ সাগরদিঘীরপাড় উল্লেখ করা হয়। মূলত তাঁদের বাড়ি সুনামগঞ্জে। তাছলিমা নাছরিন, নাসিমা বেগম ও আছমা বেগম আঞ্চলিক পণ্যাগারে সংযুক্ত পরিবার পরিকল্পনা সহকারী মো. মনসুর আহমেদের স্ত্রীর বোন হন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পত্রিকায় অনিয়ম সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর কোম্পানীগঞ্জে নিয়োগপ্রাপ্ত আয়া রাহেনা বেগমের কাছ থেকে নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র হাতিয়ে নিয়ে তাঁকে অফিস করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। শুধু আয়া নয়; পরিবার কল্যাণ সহকারী পদেও আরও অনিয়ম বেরিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version