
সুনামগঞ্জের সুনাম শুধু শুনেই এসেছি। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া। দুই চোখ খুলে জীবনের প্রথম চলে এলাম সুনামগঞ্জে ২০০২ সালে।
আগেই শুনেছি, এখানে আছেন একজন পৌর চেয়ারম্যান। হাসন রাজার প্রপৌত্র, মানে নাতির ঘরের পুতি। নাম মমিনুল মউজদীন। তিনি কবি, বিপ্লবী, লেখক, রাজনীতিক, সমাজসেবী, দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমী… আরো অনেক কিছু। তাঁর আছে এক মরিয়া বাহিনী- জেলাসহ আপপাশের যতো সুবোধবুদ্ধির ছেলেমেয়ে- সবাই এই বাহিনীর সদস্য।
এইসব কথা যার কাছে শুনেছি- সে হলো আমাদের উজ্জ্বল, মানে প্রথম আলো পত্রিকার তখনকার জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল মেহেদী। সেও ছিল মউজ-বাহিনীর সামনের সারির সৈনিক।
মউজ মানে কিন্তু শুধু মজা না; মউজ মানে ঢেউ, তরঙ্গ, জোয়ার। একদম পারফেক্ট নামকরণ। মানবীয় আবেগের উত্তুঙ্গ মূর্ত প্রকাশ ছিলেন এই মমিনুল মউজদীন। আকাশ ভাইঙ্গা জোছনার রাতে তিনি নিজ হাতে অফ করে দিতেন পৌরবিদ্যুতের সুইচ। চাঁদের আলোয় ভেসে যেতো গোটা শহর। আর মউজদীন তাঁর বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন জোৎস্নাস্নানে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, নিচে ইঞ্জিন বন্ধ বিশাল ট্রলার। তার ওপরে উর্ধমুখী, উন্নত শির, জোছনাভুক একদল তরুণ-যুবক; গান-কবিতা-আড্ডার মউজে ভেসে চলেছে বিশাল-বিপুল হাওরের বুকে।
এইসব জোছনামউজে থাকবেই থাকবে আমাদের উজ্জ্বল।
সুযোগ করে জোছনাভুক আমিও একদিন হাজির সেখানে। হাওর আমি কয়মাস আগেই দেখে এসেছি, কিশোরগঞ্জে। সুনামগঞ্জে এসে শুনি, এই এক জেলাতেই বড় হাওর আছে ৫২টা। ছোট-মাঝারি নাকি অসংখ্য। হাওর কতো বড়, প্রথম দিনেই বুঝে ফেলি। গাড়িতে করে যেতে যেতে উজ্জ্বল বললো, এবার পড়বে জেলার সবথেকে বড় হাওর; নাম- দেখার হাওর।
দেখার হাওর দেখতে দেখতে ঘুমায়ে গেলাম। কতোক্ষণ জানি না; জেগে দেখি আমাদের গাড়ির সাথে এখনো চলছে হাওর। ‘এটা কোন হাওর, উজ্জ্বল?’ জবাব শুনে আমি তো তাজ্জব! দেখার হাওর দেখতে দেখতে ঘুমায়ে পড়ছি; ঘুম থেকে উঠেও দেখি- দেখার হাওর! আশ্চর্য!!
উজ্জ্বলের গল্প শোনাতে গিয়ে হাওরের গল্প জুড়ে দিলাম কেন? কারণটা হলো, উজ্জ্বলের সাংবাদিক স্বত্ত্বাটা আসলে কোন ধাতুতে গড়া, সেইটা বোঝানোর জন্য। তো, একদিন প্রেসক্লাবে জমলো আড্ডা। যথারীতি মধ্যমণি মমিনুল মউজদীন। ‘ঢাকা থেকে আগত বড় সাংবাদিক’ হিসেবে ডাক পড়লো আমারও। গিয়ে বসলাম আড্ডায়। ‘বড় সাংবাদিক’, বড় কিছু না বললে হয়? একটা ধাঁধা ছাড়লাম আসরে। ‘বলেন তো, পূর্ণিমার চাঁদ তো ঢাকায়ও ওঠে, সবখানেই ওঠে। তো, সুনামগঞ্জের জোছনার ভোল্টেজ এতো বেশি কেন?’
গুরুতর প্রশ্ন! আড্ডা গেলো থমকে। সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। কেউ কিছু বলতে পারে না। পরে খুব একটা ভাব নিয়ে বললাম, ‘আপনাদের জোছনা, আর আপনারাই পারলেন না? খুব সহজ! ঢাকায় তো একটা চাঁদ আকাশে, আর বড়জোর হাতির ঝিলের পানির নিচে আরেকটা। কিন্তু সেটা পচা-কালো পানি। আর সুনামগঞ্জে? আকাশে একটা আর ৫২টা হাওরের টলটলে পানিতে ৫২টা; আরো কতো হাওর- সবগুলোর পানির নিচেই একটা করে চাঁদ হাসছে। সেগুলোর আলোও তো ঠিকরে বের হচ্ছে। ভোল্টেজ বেশি হবে না!
সবাই বোধহয় মনে মনে বাহবা দিলো; মনে হলো একজন ছাড়া। সে হলো উজ্জ্বল মেহেদী। জোছনার আড্ডার পরে তাকে বেশ গম্ভীর দেখালো। রাতে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম- কাল আমরা কী নিউজ করতে বেরোবো, উজ্জ্বল? উজ্জলের রেডি জবাব- মাদক। এখানে কয়েকটা পাড়ায় হেরোইন ছড়ায়ে গেছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা মদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। ‘ওদেরকে আমরা মাদকাসক্ত বা মদকসেবী বলবো না, বলবো ‘মাদকের শিকার’। এটা মনে রেখো তো! মাদক কারবারি কারা? গডফাদার কে?’
উজ্জ্বল বললো, এখন পর্যন্ত সিলেটের জ্যোৎস্না নামের এক নারীর কথা জানা গেছে। এতোক্ষণে বুঝলাম, জোছনার আড্ডায় কী খেলছিলো উজ্জ্বলের মাথায়। ওর মাথাটা যে মেড- অব দ্য নিউজ, বাই দ্য নিউজ, ফর দ্য নিউজ। পরদিন আমরা বের হলাম আর রাতে নিউজ লিখলাম দুই কিস্তি- ‘হেরোইন: সুনামগঞ্জ শহরে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ এবং ‘সিলেটের হেরোইনরানী জ্যোৎস্নার কাছে সুনামগঞ্জের জোছনা ম্লান’। এই নিউজ দুটোর পর গর্জে উঠলেন মমিনুল মউজদীন- ‘আমার শহরে মাদক! সহ্য করা হবে না।’ গড়ে তুললেন মাদকবিরোধী তুমুল আন্দোলন।
ততোদিনে ফেরত এসেছি ঢাকায়। সম্পাদক মতি ভাই আবার পাঠালেন। মউজদীনবাহিনীর উজ্জ্বলদের সাথে আমিও শামিল হলাম আন্দোলনে। দেখতে দেখতে সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে। ঢাকায়ও গড়ে উঠলো প্রথম আলোর আয়োজনে বিশাল মাদকবিরোধী সমাবেশ। সেই থেকে প্রথম আলো হয়ে গেলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার। উজ্জ্বলের ভোল্টেজ গেলো বেড়ে। ‘হাওরের ধান তুলেই ধনী’ কৃষকের মতো একের পর এক ফলাতে থাকলো নিউজের ফসল। অফিসে বসে ওর নিউজ ম্যানেজ করা এতো আরাম! নিউজের সূক্ষাতিসূক্ষ ক্রিয়েটিভ-ইনোভেটিভ কাজগুলোতে উজ্জ্বল বিরাট মুন্সি; তার সাথে ভাষার মুন্সিয়ানা মিলেমিশে ওর লেখা হয়ে যায় দারুণ সুখপাঠ্য। সেইসাথে অনুসন্ধানের গভীরতা যুক্ত হয়ে একেকটা নিউজ হয়ে ওঠে যেন সুরেশ্বরীর বহতা পাথরসঙ্গীত।
ততোদিনে প্রথম আলোয় চালু করেছি পজেটিভ নিউজের অনন্য এক ধারা। যে দেশে রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন পজেটিভ কাজ করে না বললেই চলে; করলেও মেঠো ভূতেরা সব খেয়ে ফেলে; সেই দেশ টিকে আছে কীভাবে? রহস্যটা কী? অনেক রহস্যের একটা হলো ব্যক্তি মানুষ। অনন্য কিছু মানুষ একা, নিজের চেষ্টায়, নিজের মেধায়, নিজের সংগ্রাম-সাধনায় এমন সব পজেটিভ কাজ করে চলেছেন নীরবে-নিভৃতে- সেই কাহিনীগুলো একে একে তুলে আনা।
সম্পাদক মতিউর রহমান মতি ভাইয়ের বিপুল উৎসাহে প্রথম এটা চালু হয় প্রতি শুক্রবার প্রথম পাতায় বিশেষ ট্রিটমেন্ট দিয়ে। পরে সেটা দিন পাল্টে শনিবারের নামধারণ করে। এখনো ছাপা হয় প্রতি শনিবারে- ‘সুখবর’, অন্য খবর’ নামে। তো, ২০০৩ সালে একদিন উজ্জ্বল ফোন দিয়ে বললো, ‘ভাই, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু সম্পদও আছে দেশে, যার যত্ন নিলে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। বললাম, ‘পাঠাও একটা নমুনা।’
উজ্জ্বল পাঠালো, ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে নতুন সম্ভাবনা’। আরো কিছু কোয়ারি করার পর এমন সমৃদ্ধ একটা স্টোরি দাঁড়িয়ে গেলো যে, প্রথম পাতায় লিড নিউজ করতে হলো। একসময় উজ্জ্বল নিজেই হয়ে উঠলো এক সম্পদ; আর সেই সম্পদের মর্যাদা দিতে ওকে তুলে এনে বসালাম সিলেটের পাথরে। তারপর প্রথম আলোয় ‘পাথর ঘষা আলো’র ঠিকরানি দেখে কে! তার কলমের ঘষায়, কিবোর্ডের ঘায়ে পাথরের বুক চিড়ে নিউজের ঝর্নাধারা ছোটে। ‘ঝুঁকিতে পড়ে যায় রেলের রজ্জুপথ’; ‘টিলার চূড়ায় দেখা দেয় পুকুর’; ‘বিবর্ণ হয় রাংপানি নদী’; ‘কতল হয় রাতারগুল’। এতো বছর পর শুনি, উজ্জ্বলের চাকরি নাই প্রথম আলোয়। কেন? উজ্জ্বল নাকি প্রভাব খাটিয়ে ওর বউকে নিয়ম ভেঙে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। খোঁজ নিয়ে দেখি, এই অপরাধে বউ বহাল মেডিক্যালে, কিন্তু জামাই বাতিল প্রথম আলো থেকে। পরে ইউনূসঘায়ে সেই চাকরি কতল।
কী তাজ্জব! মনে পড়ে গেলো ছোটকালের একটা ধাঁধা- ‘চামড়ার বন্দুক, হাওয়ার গুলি/মারলাম ফাঁকে, লাগলো নাকে’….. বলো তো কী? আলোর নিচেই কতো যে অন্ধকার, দেখে এসেছি নিজেও! কিন্তু আলোর ফুলকি ঠেকানো যায় না। এখন তো দৈনিক খবরের কাগজে প্রায় দিনই ঝলসে ওঠে উজ্জ্বলের দাপুটে নিউজ। সেই দাপটে ‘দিনের মিলন খান রাতে চিনি খান’; ‘চোরাই গরুর টাকা ঢুকে যায় এমপিসহ মন্ত্রীর লোকেদের পকেটে’; আরো কতো কী! উজ্জ্বলকে দমায় কে! হাওরের উজ্জ্বলতা, উজ্জ্বলের উচ্ছলতা একদিন ধপ করে নিভে যায়। সঙ্গে আমারও। সেটা ২০০৭ সালে সিডরের আগের দিন। ১৬ নভেম্বর মতি ভাই ডেকে বললেন, দক্ষিণবঙ্গে চলে যাও সিডরের নিউজ করতে। মনে মনে বললাম, সিডর তো আমার জীবনে ঘটে গেছে আগের দিনই। ভাঙা মন নিয়ে চললাম আরেক মুত্যুপুরীতে। মাথার মধ্যে ১৪ নভেম্বর- মমিনুল মউজদীন ভাই সপরিবারে ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। মাইক্রোবাসটা সরাইলের কাছে এসে হঠাৎ…। এই পর্যন্ত ভাবতে পারি। আর এগোতে পারি না। শুধু বড় ছেলেটাই বেঁচে আছে ভয়ানক শারীরিক-মানসিক ট্রমা নিয়ে; কমলগঞ্জে আমার বাসার পাশেই, মামা সঙ্গীতশিল্পী সেলিম চৌধুরীর বাড়িতে। আমি সামনে যেতেই পারি না!
ওই দুর্ঘটনার পর কয়েক বছর উজ্জ্বলের সাথে কথা হয়নি- মউজদীন মনে ভেসে উঠবে, সহ্য করতে পারবো না- বোধহয় এই ভয়ে। তবে থেমে থাকে না কাজ। এখনো পূর্ণিমার চাঁদ আসে আকাশে। আমি নিজেও চলে এসেছি হাওরের কাছে। উজ্জ্বল সিলেটে বসে এখনো লিখে চলে নিউজ। কিন্তু মনের অজান্তেই মনের গহীনে কোথায় যেন চিনচিনে সুরে বেজে চলে দেওয়ান মমিনুল মউজদীনের কবিতা- ‘কতদিন তোমাকে দেখি না’।


