

পাহাড় কে বলা হয় পৃথিবীর লৌহ দন্ড। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ই একমাত্র মাধ্যম। পাহাড়কে ভর করেই প্রকৃতি তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। এক শ্রেনির ভূমিদসূরা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পাহাড় গুলোকে সাবাড় করছে। জৈন্তাপুর সীমান্তবর্তী সিলেটের পাহাড়ি উপজেলা হিসেবে পরিচিত। উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি পাহাড় ও টিলা রয়েছে। সেসব পাহাড় গুলোর উপর থাবা পড়েছে ভূমি খোকোদের। তারা পাহাড়ের মাটি কেটে বিক্রি, আবাস্থল গড়ে তোলাসহ নানা স্বার্থে এসব পাহাড় গুলোকে নির্বিচারে হত্যা করছে।

সকাল থেকে রাত সমান তালে চলে পাহাড় কর্তন অব্যাহত রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ে নিঝুম রাতে ও ভোর বেলাতে জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় ও টিলা কর্তন করছে। গত কয়েক বছরে জৈন্তাপুর উপজেলার প্রায় অর্ধেকের পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের মাঝে চাপা ক্ষোভ থাকলেও পাড়ার খেকুদের প্রভাবে এবং ভয় ভীতির কারণে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে পারছেন না। চক্রটি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে রাতের আধাঁরে কিংবা ভোর পাহাড়ের মাটি কেটে পাহাড় মানচিত্র হতে বিলিন করে দিচ্ছে। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র হুমকি মুখে পড়েছে।

পাহাড় ধ্বংসকারিরা হল জৈন্তাাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের উমনপুর গ্রামের মৃত কুদরত উল্লার ছেলে মাসুক আহমদ, মানিক মিয়া, উমনপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে জোয়াদ আলী, ফতেপুর ইউনিয়নের উপরশ্যামপুর গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে আনোয়ার হোসেন, উমনপুর এরাকার নুর মিয়া হাজীর ছেলে মোহাম্মদ আলী ও সেলিম আহমদ গংরা। সম্প্রতি সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেড ১০নম্বর কুপের রাস্তা নির্মানে জন্য পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরেজমিন জৈন্তাপুর উপজেলার ফতেপুর ও চিকনাগুল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম দেখা যায়, উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে মাটি কেটে করা হয়েছে সমতল। পাশেই অস্থিত্ব হারানো পাহাড়ের ক্ষত চিহ্ন। কোথাও কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে সমতল করা জায়গায় স্থানীয় এক শ্রেনির বাসিন্দারা ঘর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। যথারীতি জৈন্তাপুর উপজেলা ফতেপুর ও চিনাগুলে পাহাড় কাটার যুদ্ধ চলছে। সে সঙ্গে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিধন করা হচ্ছে। প্রকৃতির বুকে মানুষের এমন থাবায় জীব বৈচিত্র এখন হুমকির মুখে।
পাহাড়ের কর্তন কাজে ব্যবহৃত করা হচ্ছে অত্যাধুনিক এক্সেভেটর, ফেলুডার মেশিন। যার মাধ্যমে দ্রæততার সঙ্গে পাহাড়ের মাটি গুলোকে কেটে ফেলা হয়। মাটি কেটে সে গুলোকে ট্রাক যোগে বিভিন্ন স্থানে বিক্রিয় করা হয়।
স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বিচারে ও অপরিকল্পিত ভাবে পাহাড় কর্তনের ফলে গত বর্ষা মৌসুমে উপজেলার চিকনাগুল ও চারিকাটা ইউপিতে টিলা ধসে ৬জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তার পরেও থেমে নেই পাহাড় কর্তন। চলতি বর্সা মৌসুমে ভারী বর্ষন হলে মৃত্যু কুপে পরিনত হবে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা।

স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে পাহাড় কাটা শুরু হয়। দুটি ইউনিয়নে প্রায় তিন ভাগের মধ্যে দুই ভাগই পাহাড় কর্তন করা হয়েছে। আমাদের বাপ-দাদা আমল থেকে দেখে আসছি এই পাহাড় গুলো। শত শত বৎসর পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে আমরা বড় হয়েছি। অথচ একটি পাহাড় খেকু মহল নির্বিচারে কর্তন করছে। যার ফলে সিলেট জৈন্তাপুরের জীববৈচিত্র পরিবর্তন হচ্ছে। পাহাড়ের মাটি দিয়ে ভিবিন্ন খাল বিল ভরাট করার ফলে অল্প বৃষ্টিতে বন্যার পানিতে প্লাবিত হচ্ছে পুরো উপজেলা। ফসলি জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যা আর্থিক ভাবে অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসিল্যান্ড ঘটনাস্থলে এসে অভিযান পরিচালনা করে পাহার ও টিলার মাটি বোঝাই ৩টি ট্রাক পাওয়ার পরও জব্দ কিংবা জরিমানা করা হয়নি বলে জানান এলাকাবাসী।
সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিপা মনি দেবী বলেন, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ একটি বেআইনি কাজ। এটি কোন ভাবে গ্রহণ যোগ্য নয়। খবর পেয়েছি একটি চক্র গভীর রাতে পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমি অভিযানে যাওয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে বালু বোঝাই ৩টি ট্রাক ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কাউকে না পাওয়ায় জরিমানা করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি পরিবেশের কাজ তারপরও আমি সার্বক্ষণিক বিষয়টি মনিটরিং করছি। যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।


