////

পাখি ধরতে ফাঁদ সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে

23 mins read

শীতের শুরুতেই মৌলভীবাজারে তৎপর হয়ে উঠেছেন শৌখিন ও পেশাদার পাখিশিকারিরা। শিকারিরা রাতের বেলা হাওর এবং হাওরসংলগ্ন জলাভূমিতে জালের ফাঁদ পেতে রাখছেন। এতে অন্ধকারে ওড়ার সময় পরিযায়ীসহ দেশীয় পাখি এসব জালের ফাঁদে আটকা পড়ছে। মারা পড়ছে বিপন্ন প্রজাতির অনেক পাখিও।

বৃহস্পতিবার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওর সংলগ্ন একাটুনা ইউনিয়নের বড়তল মাঠের দিশালোক, উত্তর মুলাইম, বরমান, কুইশার, একাটুনা এলাকার কয়েক কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঠের নিচু এলাকায় কিছুটা দূরে দূরে পাতা আছে জালের অনেক ফাঁদ। ওই জালগুলো শৌখিন ও পেশাদার পাখিশিকারিদের। পরিযায়ী পাখি আসা শুরু হতেই তৎপর হয়ে উঠেছেন পাখি শিকারিরা। এসব জালে পরিযায়ীসহ দেশীয় পাখি অন্ধকারে ওড়ার সময় আটকা পড়ে। ধানখেতের শিশিরভেজা আল ধরে এসব পাতা জালের কাছে যেতে চাইলেও যাওয়া সম্ভব হয়নি। হাঁটু বা ঊরু সমান কাদাপানির ভেতরে ওই জালগুলো পাতা হয়েছে। সে সময়ে চারদিক ঘুরে অন্তত ১০টি ছোট–বড় জাল দেখা গেছে। কুয়াশায় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায়নি। দূর থেকে দু–একটি জালে ফিঙের মতো কালো রঙের পাখি ঝুলে থাকতে দেখা যায়।

এদিকে উত্তর মুলাইমের দিক থেকে মাঠের দিকে যেতে চাইলে একটি নিচু জমি থেকে একঝাঁক শামুকখোল উড়াল দেয়। সেগুলোর কাছেই পাতা ওই জালের ফাঁদ। এই এলাকায় রাতের বেলা ২০–২৫টি জাল পাতা হয়ে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক কৃষক ওই জাল পাতা সম্পর্কে ভিন্ন একটি তথ্য দেন। তিনি বলেন, বোরো ধানের হালি চারা তৈরি করা হচ্ছে। পাখি এসে বীজতলা নষ্ট করে ফেলে, এ জন্য জাল পেতে রাখা হয়েছে। জাল দেখে ভয়ে আর পাখি আসে না। তবে জালগুলো মাঠের এতটা গভীর অংশে যে সেখানে হালিচারা তৈরির কোনো আলামত চোখে পড়েনি।

পরিবেশকর্মী জাবেদ ভূঁইয়া বলেন, এই এলাকায় আমি নানা ধরনের পাখি দেখেছি। নাম জানি না, এ রকম অনেক ধরনের পাখি আছে। এভাবে জালের ফাঁদে শুধু পরিযায়ী পাখিই নয়। ফিঙে, প্যাঁচা, বকসহ স্থানীয় অনেক পাখি আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। শীতের শুরুতেই মানুষের মধ্যে পাখি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে প্রচারণামূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শীতের শুরুতেই মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরের বাইক্কা বিলসহ ছোট ছোট হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিলে পরিযায়ী পাখি আসা শুরু হয়। সাইবেরিয়াসহ শীতপ্রধান অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তুলনামূলক উষ্ণ অঞ্চলে খাদ্যের খোঁজে এসব পাখি আসে। বিভিন্ন জাতের হাঁসসহ অনেক ধরনের পাখির কাকলিতে সরব হয়ে ওঠে হাওরের বুক। সারা দিন বিলে বিলে পাখির ওড়াউড়ি চলে। পাখির এই আগমন শুরু হলেই তৎপর হয়ে ওঠেন শৌখিন ও পেশাদার পাখিশিকারিরা। শুরু হয় হাওরসংলগ্ন জলাভূমিতে জালের ফাঁদ পেতে ও বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার। এরই মধ্যে হাইল হাওরের বাইক্কা বিল ও বাইক্কা বিলসংলগ্ন এলাকা, কাউয়াদীঘি ও হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন পাশে পাখিশিকারিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজন আহমদ বলেন, আমাদের সমাজে অনেক পাখিপ্রেমী মানুষ আছেন। যাঁরা নিজের সন্তানের মতো পাখি ভালোবাসেন। অনেক ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও বসতবাড়িতে আশ্রয় নেওয়া পাখিকে আগলে রাখেন তাঁরা। আবার কিছু মানুষ আছে যারা সুযোগ পেলেই বিভিন্ন ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে। অথচ এসব দেখার যেন কেউ নেই।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ অনুযায়ী পরিযায়ীসহ কোনো পাখি হত্যা করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হবে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, শীত শুরু হচ্ছে। পাখিশিকারিরা তৎপর হয়ে উঠছেন। আমরা এটা টের পাচ্ছি। এরই মধ্যে রাত জেগে বাইক্কা বিলে পাখি শিকারিকে ধরেছি। সাজাও হয়েছে। জাল উদ্ধারে অভিযান চালানো হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version