
দারিদ্র্যতার কষাঘাতে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে ঘানি টেনে জীবিকা নির্বাহ করছেন জহুরুল (৫৬) ও তার পরিবার। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের কালিয়াবিল এলাকায়। তিনি মৃত রফাত আলী প্রামাণিকের ছেলে। চাষাবাদের জমি নেই, জরাজীর্ণ বসত ভিটায় ভাঙ্গা ঘরে বসবাস যেখানে অবাধে দিনের বেলায় সূর্যের আলো আর রাতের বেলায় চন্দ্রের আলো যাতায়াত করে।
পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী মিনা বেগম, এক মেয়ে ও তিন ছেলে। তেলের ঘানি টেনে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় তাকে। সংসারের যাবতীয় খরচ চলে এ আয়ের ওপর নির্ভর করে। ইতোমধ্যে তিন ছেলে ও এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি।
এই অমানষিক পরিশ্রমের মাধ্যমেই ঘুরে তাদের সংসারের চাকা। কড়ি কাঠের তৈরি কাতলার উপর প্রায় দুইশ কেজির পাথর বসিয়ে ঘাড়ে জোয়াল বেধে এই ঘানি টানেন তারা। ঘানির টানে ডালার ভিতর সরিষা পিষ্ট হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় তেল পড়ে নিচে রাখা পাত্রের মধ্যে। স্থানীয় হাটে এই তেল বিক্রি করলেই চলবে সংসার। প্রতিদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত এভাবেই জীবন সংগ্রাম চালান হতদরিদ্র জহুরুল প্রামাণিক ও মিনা বেগম দম্পতি। জমি বলতে তাদের ওই বাড়ির ভিটেটুকুই। বংশ পরম্পরায় তারা এই পেশা ধরে রেখেছেন।
সম্প্রতি ঐ বাড়িতে গিয়ে কথা হয় জহুরুল তিনি জানান, প্রায় ৩৮ বছর ধরে আমি ও আমার স্ত্রী মিলে ঘানি টেনে খাঁটি সরিষার তেল বের করে বাজারে বিক্রি করি। সামান্য আয় দিয়েই কষ্ট করে চালাতে হয় সংসার। কিন্তু অভাব অনটনের সংসারে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ঘানির গরুটিও বিক্রি করতে হয়েছে আমাকে। স্ত্রীসহ কষ্ট করে ঘানি টানলেও লজ্জায় কারও কাছে হাত পাতিনি।
স্ত্রী মিনা বেগম বলেন, বয়স হয়েছে, তাই ঘানি টানতে আমাদের খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু উপায়ও নেই, কি করব? তিনি আরও বলেন, বিয়ের পর থেকেই কাঠের ঘানি টানছেন। কাজটি কঠোর পরিশ্রমের ও খুবই কষ্টের। আব্দুল হামিদ নামে এক প্রতিবেশী বলেন, এই প্রথম আপনি তাদের খোঁজ-খবর নিতে এসেছেন। জীবিকার সন্ধানে একটি গরু ও একটি থাকার ঘরের দাবি জানান তিনি।
শিক্ষক আব্দুল বাতেন তালুকদার ও অপর একজন বয়োবৃদ্ধ তালেব সরকার বলেন, এ যুগেও ঘানি টেনে সংসার চালাতে হয়-এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক। আমরা সমাজের বিত্তবান ও দাতা সংস্থাকে আহবান জানাবো। এই অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ হাসান খান জানান, আমি আগে জানতাম না। বিষয়টা খুবই অমানবিক। আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। তারা যদি আবেদন করে তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেন তিনি। সচেতন মহল মনে করেন, কেউ যদি তাদের একটা গরু ও একটি থাকার ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন তাহলে হয়তো জীবিকার সন্ধান পেতেন। পাশাপাশি ঘানি টানার হাত থেকে রক্ষা পাবে এই পরিবার।


