/

ফুটপাতে বিক্রি হওয়া সিমে বাড়ছে অপরাধ

25 mins read

মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য করোনা টেস্ট করাতে কুমিল্লার একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন রায়হান (ছদ্মনাম)। নমুনা দেওয়া পর এক অচেনা নম্বর থেকে কল আসে তাঁর মোবাইল ফোনে। ফোন রিসিভ করতেই অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তি জানান, তাঁর করোনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে। তবে টাকার বিনিময়ে রিপোর্ট নেগেটিভ করা যাবে।
হাসপাতাল থেকে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে এভাবে প্রতারণা করে আসা চক্রের কয়েক জন সদস্যকে সম্প্রতি আটক করেছে র‍্যাব। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের নামে নিবন্ধন করা সিম ব্যবহার করেই প্রতারণা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে তারা। চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের সময়ে বিপুল পরিমাণ বেনামি সিম উদ্ধার করে র‍্যাব। আর এই সিমগুলো সংগ্রহ করা হয় ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকেই।
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ দমনে সেলফোন অপারেটরদের প্রতিটি সিম বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের আওতায় এনেছে সরকার। কিন্তু এতেও দমছে না অপরাধ। প্রতারকেরা নতুন কৌশলে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো ধরনের পরিচয়পত্র ছাড়াই ঢাকার ফুটপাতে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানির সিম। চাহিদা মতো টাকা দিলেই পাওয়া যায় তা। পরিচয় গোপন করে এই প্রতিবেদকও দুটি সিম সংগ্রহ করেছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার ফুটপাত থেকে। এর মধ্যে একটি সিমের নম্বর ০১৭৩১১১৬ ***। মনির হোসেন নামের এক বৃদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সিমটি নিবন্ধিত। ফুটপাত থেকে সংগ্রহ করা আরেকটি সিমের নম্বর ০১৯৫১৪৮৭ ***। সিমটির মালিক হাজেরা বেগম নামের এক মধ্যবয়স্ক নারী। ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর ঠিকানা ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। এই ধরনের হাজার হাজার সিম ছড়িয়ে আছে ফুটপাতের দোকান গুলোয়, যেগুলোর আসল মালিক জানেনই না তাঁর নামে নিবন্ধন করা সিম কে কী কাজে ব্যবহার করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, করোনা টেস্টের ফল পরিবর্তন, ইমো প্রতারণাসহ বিভিন্ন অপরাধে প্রতারকদের মূল হাতিয়ার ফুটপাত
থেকে কেনা সিম। এ ধরনের সিম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে নানা সময় বিভিন্ন চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
সাইবার ক্রাইম বিভাগেরই অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল হক বলেন, বর্তমান সময়ে সব ধরনের প্রতারণার মূলে রয়েছে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম। অনলাইনে প্রতারণার ক্ষেত্রে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন বা অনিবন্ধিত সিম ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ৮০ ভাগ সিম অন্যের নামে নিবন্ধন করা।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) (কনফিডেনশিয়াল) সাইদ নাসিরুল্লাহ বলেন, বর্তমান সময়ে যেসব সিম ব্যবহার করে সাইবার ক্রাইমসহ বিভিন্ন ধরনের যে অপরাধগুলো হচ্ছে, তার অপরাধীদের ট্র্যাকিং করে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কারণ, এই সিম গুলো ভুয়া না, বেওয়ারিশও না। সমাজের সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষদের অর্থের বিনিময়ে ভুল বুঝিয়ে সিমগুলো তাদের নামে রেজিস্ট্রেশন করে নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে একটি চক্র। ফলে সিম দিয়ে অপরাধ করার পরে যাদের পাওয়া যায় তারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। আর যারা অপরাধ করছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ ফুটপাতে সিম বিক্রির বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা এক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, যেকোনো সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো কাজ করে। আর নিবন্ধন দেওয়ার কাজটি করে বিটিআরসি। বিটিআরসিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়েছে, ফুটপাতে সিম বিক্রি হলে প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বাড়ছে। একটা আইডি কার্ডে শতাধিক সিম নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে অনেকেই টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। এটা বন্ধে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি কোন কোন পয়েন্টে সিম বিক্রি করা হচ্ছে।
বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান সুব্রত রায় মিত্র বলেন, ফুটপাতে সিম ব্যবহার করে অপরাধ হয়, এ অভিযোগ সত্য। বিটিআরসির একটি পার্ট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন বিভাগ সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এখতিয়ার আছে তাদের ধরার। তারা ধরছে। চোর-পুলিশ বিষয়টা চিরকাল চলে। তবে এটুকু বলতে পারি, আমরা কাজ করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version