///

এলিজা বিনতে এলাহীর ইদিলপুরে (মাদারীপুর) আধ বেলা

36 mins read

পর্যটক লেখিকা এলিজা বিনতে এলাহী :: মাদারীপুর জেলার প্রাচীন নাম ইদিলপুর। প্রাচীন সময়ে ইদিলপুর চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা রাজ্যের একটি উন্নত জনপদ ছিল। চন্দ্রদ্বীপ ও বাকলা বর্তমানের বরিশাল। ফরিদপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জে একাধিকবার ভ্রমণ করলেও, ২০১৯ সালের পর মাদারীপুর ভ্রমণ আর হয়ে উঠেনি। প্রতিবছরই ঈদের দিন আধ বেলা ঐতিহ্য ভ্রমণে যাই পরিবারসহ। এই ঈদে মাদারীপুর বেছে নেবার কারণ হলো নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ পরিভ্রমণ করা।

দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ পরিভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল বেশ কয়েকটি তার মধ্যে দুটি বিষয় অন্যতম, একটি হলো ৬৪ জেলার নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে দেখা, অন্যটি ৬৪ জেলার খ্রিষ্টান সমাধিক্ষেত্র। দুটো কাজই চলমান। মদারীপুর জেলার নীলকুঠী পরিভ্রমণের সাথে শেষ হলো ঢাকা বিভাগের নীলকুঠির একটি প্রাথমিক খসড়া।

মাদারীপুরের আধবেলার অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল– পদ্মা সেতু পার হবার পর, তথাকথিত নগর, যত্র তত্র আধুনিক বাজার পেরিয়ে যখন কেবল গ্রামীণ পরিবেশে প্রবেশ করলাম, পথে পথে গুলমোহরের রঙ মনকে আন্দোলিত করলো। শুধু কি গুলমোহর, গ্রীস্মের জারুল, সোনালুতে ছেয়ে আছে পুরো মাদারীপুর। ৪ বছরে কেমন বদলেছে এই জনপদ! ইট, সিমেন্টের স্থাপনা বেড়েছে, পথ ঘাট উন্নত হয়েছে, প্রত্নস্থল গুলো আরও জীর্ন হয়েছে ।

জেলা শহরের কেন্দ্রে বিশাল জলাধার শকুনীর পাড়ে ভীড় বেড়েছে সীমাহীন। লোক সমাগম প্রচুর। সেটি সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, সারি সারি চটপটির দোকান। সেটিও সমস্যা নয়, আবর্জনা, চিপস, বিস্কুটের প্যাকেট সব ছড়িয়ে থাকে শুকুনীর পাড়ে। শকুনী বয়স কতো সঠিক তা জানা যায় না। তবে এই অঞ্চলের সুপেয় জলের ঘাটতি পূরণের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। জেলার জনবসতির দারুন এই বিনোদন কেন্দ্রের আরও যত্নের প্রয়োজন ।

দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল কুলপদ্মী জমিদার বাড়ি। আমাদের দেশে কারুকাজ করা যে কোন অট্টালিকা পুরোনো যে কোন অট্টালিকা দেখলেই আমরা বলি জমিদার বাড়ি। সেটি একদম সঠিক নয়। আসলে এই পরিত্যক্ত বাড়ি গুলোর বেশির ভাগেরই সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। কেবল কিছু কিছু জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করেই গল্প রচিত হয়। এই বাড়ি গুলোর কোন কোনটি জাতিদার, ভূস্বামী কিংবা অভিজাত বণিকদের বাড়ি ছিল আসলে। তবে মাদারীপুর সদর উপজেলায় কুলপদ্মী গ্রাম ১৮৫৯ সালে মহকুমা প্রতিষ্ঠার পুর্ব হতেই উন্নত ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি গুলো পরিত্যক্ত হবার পর তাদের নির্মিত ভবন গুলো ব্যবহৃত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস হিসেবে।

কুলিন বংশের এক হিন্দু ভদ্রলোকের নাম অনুসারে এই অঞ্চলকে কুলপদ্মী নাম রাখা হয়। এই গ্রামটি ছিল বণিক দের অঞ্চল। সেই ধনী বণিকদের মধ্যে শশী রায় ছিলেন অন্যতম। শশী রায় (১৩৩৯ বঙ্গাব্দে ইংরেজি ১৯৩২) সালে বাড়িটি স্থাপন করেন বলে জানা যায়। এই বাড়িতে মোট ৩টি ভবন রয়েছে, অন্দরমহল ও বারান্দা সহ একতলা ভবন, আরেকটি ভঙ্গুর দেড়তলা এবং অন্যটি একতলা ভবন। অবয়ব দেখে কয়েকটি ভবনকে মন্দির মনে হয়। বাড়ির আশেপাশে ৬ টি মঠ রয়েছে যার মধ্যে ৩টি অর্ধভঙ্গুর, ৪টি শান- বাঁধানো জলাধার।

তবে এবার চত্বরে প্রবেশ করে চিনতে পারছিলাম না জায়গাটি। ৬টি মঠের মাঝে এখন দুটি জঙ্গলে ঢেকে আছে খুব খেয়াল না করলে চোখে পড়বে না মঠ দুটো। পুকুর ঘাট গুলোর অবস্থা আরও নিদারুণ। ভবন গুলোর কারুকাজ খুঁচিয়ে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। দুতিনটা অফিসের সাইনবোর্ড ঝুলছে। তার মাঝে অবশ্যই ভূমি অফিস রয়েছে। লোকজন বসবাস করছে। কেউ কথা বলতে রাজী হলেন না। তবে ছবি তুলতে নিষেধ করেননি।

মূল বিষয়ে আসি, সেটি হলো নীলকুঠি। মাদারীপুরে নীলচাষের ইতিহাস পাওয়া যায় ১৮২৬ সালের দিকে। এই অঞ্চলের ব্রিটিশ নীলকর ছিলেন ডানলপ। এখন যে নীলকুঠীর ধ্বংসাবশেষ রয়েছে , স্থাপনার অবয়ব বলে এটি নীল কারখানা ছিল। ঢাকা বিভাগের অনেক জেলায় এইরকম চুল্লি বা চিমনি দেখেছি আমি। তবে দক্ষিন অঞ্চলের আর কোন জেলায় যেমন, যশোহর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, খুলনা কিংবা বরিশালে আমি দেখিনি। সেখানকার সব গুলোই নীলকুঠি কারখানা নয় বলে অনুমেয় হয়। নীলকুঠি যেখানে নীলকররা বসবাস করতেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলতো আর চিমনী সংযোজিত জায়গায় নীল উৎপাদনই হবার কথা। আবার কোন কোন অঞ্চলে নীলকুঠি আর কারখানা একই চত্বরে স্থাপন করা হয়।

নীলকর ডানলপের সমাধি আমি দেখেছি ফরিদপুরে। যদিও সমাধিটি ভেংগে গেছে। কয়েকটি টুকরো মাটিতে পতিত আছে, যেখানে ডানলপের নাম খোদিত আছে।

মাদারিপুরের নীল কারখানার অবস্থান মাদারীপুর আর শরিয়তপুরের সীমান্তে। এই কারখানা আমিও আগেও দেখেছি। চত্বরে পৌঁছে সেটি বুঝলাম। শরিয়তের পুরের ইতিহাসে এই কারখানার কথা লেখা রয়েছে। মাদারীপুরের ইতিহাস এটির কথা লেখা রয়েছে। আমি মনে মনে খুশী হচ্ছিলাম নতুন আর একটি কারখানার ভগ্নাংশ দেখতে পাবো বলে। কিন্তু গিয়ে বুঝলাম স্থাপনা একটিই। একই স্থানে দুবার যাওয়া হলো কিন্তু পার্থক্যটা বুঝে ও জেনে বেশ ভালো লেগেছে। এই কারখানাটি তৈরি হয়েছিল ১২ একর জায়গা জুড়ে। সেখানে এক বটগাছের তলায় মাজার , পাশে মসজিদ মাঝে নীল কারখানার ভগ্নাংশ। পাশের নীলকুঠি নামক বাজারও মনে গড়ে উঠেছে নীল কারখানায় জায়গায়। মাদারীপুর জেলার ছিলারচর এলাকার আউলিয়াপুর গ্রামে এই নীল কারখানার অবস্থান। আর শরীয়তপুর জেলা থেকে মাহমুদপুর ইউনিয়নে গেলে এই নীল কারখানা দেখতে পাওয়া যাবে। তবে নীল কারখানার অবস্থান মাদারীপুরে।

মাদারীপুরের ইতিহাস আলাদা করে লেখা ভীষণ মুশকিল। মাদারীপুর, চন্দ্রদ্বীপ, বাকলা, ফরিদপুর ও বিক্রমপুর বাঙালী জাতির আদি বাসস্থান। হযরত বদরুদ্দিন শাহ মাদারের নামে এই জেলার নামকরণ হয়েছে। তিনি ১৫ শতকে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য মাধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলায় আগমন করেন। মাদারীপুর শহরে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে তাঁর মাজার অবস্থিত।

ঐতিহ্য কিংবা সমৃদ্ধির কমতি নেই মাদারীপুরের কিন্তু সেই আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ইতিহাস ও স্থাপনা আপনাকে খুঁজে দেখতে হবে ।

যারা মাদারীপুর জেলা নিয়ে আগ্রহী তারা “মাদারীপুর জেলার ইতিহাস” বইটি পড়তে পারেন। সিরাজ উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন বইটি। আমাদের দেশে কিছু তথাকথিত ট্রাভেলার আছেন যারা বাংলাদেশ ভ্রমণ, কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে মোটেও আগ্রহী থাকেন না, এই লেখাটি তাদের জন্য নয়। কেউ কেউ মনে করেন ইতিহাস তো উইকিপিডিয়াতে পাওয়া যায়, ভ্রমণ রচনায় আবার ইতিহাসের কথা কেন ।তাদের উদ্দেশ্যে স্মিত হাসি ছাড়া আর কিছু বলার নেই। আমার এই ছোট্ট ইতিহাস সম্বলিত ভ্রমণরচনার কোন কোন বিষয়টি উইকিপডিয়াতে আছে, আমার জানা নেই। ঐতিহ্য ভ্রমণরচনা নিজস্ব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আর ইতিহাসের গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে তৈরি হয় !

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version