//

কৃষি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি মৃত ব্যক্তির নামেও ঋণ

24 mins read

২০১৫ ও ২০১৬ সালে ওই ঋণ বিতরণ করা হয়। একজনের কাগজ ব্যবহার করে ঋণ নিয়েছেন আরেকজন। কৃষি ব্যাংকের রাজবাড়ী শাখায় ঋণ বিতরণে অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়েছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ওই ঋণ বিতরণ করা হয়। ওই সময় মৃত ব্যক্তির নামেও ঋণ দেওয়া হয়েছে। আবার একজনের কাগজপত্র ব্যবহার করে ঋণ নিয়েছেন আরেকজন।

ওই দুই বছরে ব্যাংকটির রাজবাড়ী শাখা থেকে ১ হাজার ৬০১ জনকে ঋণ দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। তাঁদের মধ্যে ৪৫৮ জনের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা দেয় ব্যাংকের অডিট কমিটি। ওই ঘটনায় ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ব্যাংকের শাখা সূত্রে জানা যায়, ধান, পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের জন্য এসব ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৭ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে বেশির ভাগ ঋণ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। ১ হাজার ৬০১ জনকে ঋণ দেওয়া হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা ছিল। ইতিমধ্যে ৮৬৭ জন ঋণ পরিশোধ করেছেন। বকেয়া টাকার পরিমাণ তিন কোটি টাকার কিছু বেশি। আর ব্যাংকের ওই শাখায় মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

ব্যাংকঋণের জন্য আবেদনকারীকে সশরীর ব্যাংকে উপস্থিত হতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট আকারের ছবি, বাড়ির জমির খাজনা প্রদানের রশিদ, জমিজমার পরচা বা দলিল দিতে হয়। ব্যাংক কর্মকর্তা বা মাঠকর্মীরা তা সরেজমিনে যাচাই বাছাই করেন। তথ্যের সত্যতা পাওয়ার পর ব্যাংক ব্যবস্থাপকের কাছে প্রতিবেদন আকারে জমা দেন। এরপর ঋণ দেওয়া হয়।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন রহিম ধাবক। তিনি বার্ধক্যের কারণে ২০০৫ সালে মারা যান। অথচ তাঁর নামে ২০১৫ সালের ২ আগস্ট ৬০ হাজার টাকা কৃষিঋণ নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা এই ঋণের বিষয়ে জানতেন না। গত বছর বাড়িতে নোটিশ আসার পর তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন।

আবদুর রহিম ধাবকের ছেলে শহীদুল ধাবক বলেন, আমার বাবা বা আমরা কেউ কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিইনি। যে ব্যক্তি ঋণ নিয়েছিলেন, তিনি পরিশোধ করে দিচ্ছেন। যত দূর জানি ব্যাংকের ঋণ প্রায় পরিশোধ হয়ে গেছে। তবে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

ঋণ জালিয়াতিতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে তাঁরা টাকা নিয়েছেন। এ ঘটনায় ব্যাংকের তৎকালীন কর্মরত দুই কর্মকর্তা রেজাউল হক ও মোর্তজা আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে রাজবাড়ী শাখার ব্যবস্থাপক মোতাহার হোসেন বলেন, আমি এই শাখায় যোগদান করেছি চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি। আর এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দিকে। এ বিষয়ে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় একটি তদন্ত কমিটি করেছে। কমিটি তদন্ত করার পর প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু কত টাকা ভুয়া ঋণ, তা এখনো জানি না।

খানগঞ্জ ইউনিয়নের খোশবাড়ী ও গোবিন্দপুর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, অন্তত ১২ জনের নামে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে।

খোশবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, গত বছর ব্যাংকে গিয়ে ঋণের আবেদন করেছিলেন আমার বাবা। তবে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, বাবার নামে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া আছে। তা সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি বাস্তবে কোনো ঋণ নেননি। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি, ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সহায়তায় স্থানীয় এক ব্যক্তি বাবার নাম ও জমির পরচা দিয়ে ঋণ নিয়েছেন। ওই ব্যক্তিকে চাপ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। আমাদেরও কিছু টাকা জমা দিতে হয়েছে।

গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা ইউসুফ মন্ডল বলেন, আমাদের দুই ভাইয়ের নামে ব্যাংকঋণের লাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পরে ইউপি চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকে যাই। সবকিছু খুলে বলি। খোঁজ নিয়ে দেখি, আমার আরও এক ভাইয়ের নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আমার নামে হরিহরপুর গ্রামের আবদুল আলিম নামের এক ব্যক্তি ঋণ নিয়েছেন।

খানগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আতাহার হোসেন বলেন, এই এলাকায় ব্যাংকঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অনিয়ম হয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তিদের ঋণ দেওয়া হয়েছে। অনেক ব্যক্তি ঘুষ না দেওয়ায় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পায়নি। আবার অন্যের জমির ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। ভুয়া ঋণের বিষয়ে তিনি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে একাধিকবার কথা বলেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x