/

জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস (পর্ব-২)

34 mins read

জৈন্তিয়ার পতনের ইতিহাস / পর্ব-২

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মার্চ, দখলদার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্ত সিলেট লাইট ইনফেনট্রির দুই কোম্পানি সৈন্য সে দিন হঠাৎ করেই দখল করে নেয় ৷ হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার লীলাভূমি স্বাধীন জৈন্তিয়া রাজ্য। ইংরেজদের এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ছাতকের ইংলিশ কোম্পানীর ক্যাপ্টেন হেরি ইংলিশ। সিলেটের ইংরেজ সেনাপ্রধান লিস্টারের অধীনেই তিনি এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হেরি ইংলিশ খাসিয়া পাহাড়ের চুন কারবারের সাথে জড়িত থাকায় খাসিয়াদের সম্পর্কে তাঁর বেশ জানাশোনা ছিল। জৈন্তিয়ার রাজা রাজেন্দ্র সিংহের সাথে তাঁর খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। তিনি প্রায়ই জৈন্তিয়ায় যাতায়াত করতেন। এই পূর্ব পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে কৌশলে জৈন্তিয়া দখলের জন্যই তাকে মনোনীত করা হয়েছিল।

জৈন্তিয়ার রাজা রাজেন্দ্র সিংহ হেরি ইংলিশকে তাঁর বন্ধু মনে করতেন। তাই ইংরেজদের আগমণকে তিনি বেশ স্বাভাবিক ভাবেই দেখেছিলেন। হেরি ইংলিশ রাজাকে জানালেন যে, তিনি সদলবলে জৈন্তিয়ার রাজধানী ভ্রমণ করতে এসেছেন। রাজাও তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন এবং অতিথিদের সমাদরের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা রাজধানীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোর দখল নিতে শুরু করেছে। সারা রাজধানীতে হুলুস্থূল পড়ে গেল। এ পরিস্থিতিতে রাজার সেনাপতি এবং সৈন্যরা দৌড়ে এসে রাজাকে বিষয়টি অবহিত করল।

সরল হৃদয় রাজা এই অভিনব বিশ্বাসঘাতকতায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লেন এবং পরিস্থিতির মোকাবিলায় চূড়ান্ত অজ্ঞতার পরিচয় দিলেন। এ ধরণের পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা তিনি বুঝেই উঠতে পারছিলেন না। ইংরেজ সৈন্যরা তখন নগরী জুড়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালাচ্ছে। রাজার মন্ত্রী ও সেনাপতি যুদ্ধের অনুমতি চাইলেন। কিন্তু রাজা এতে ব্যাপক প্রাণহানীর আশংকা করে যুদ্ধের আদেশ প্রদান থেকে বিরত রইলেন। রাজা সবকিছুকেই তাঁর বিধিলিখন মনে করে এই অশুভ পরিণতিকেই মেনে নিলেন।

রাজা তাঁর সৈন্যদেরকে প্রবোধ দিয়ে বললেন- এখন যুদ্ধ করা কোন ভাবেই সমীচিন নয়। নগরীর ভিতরে যুদ্ধ হলে অনেক প্রজার প্রাণহানীর সম্ভাবনা রয়েছে। যা কিছু ঘটেছে তার সবই বিধাতার ইচ্ছায়ই ঘটেছে। তা না হলে বন্ধু হয়ে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবে কেন? বোধ হয় আমার রাজত্বের অবসান হয়ে গিয়েছে। অতএব যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। এদিকে ইংরেজ সৈন্যরা সারা নগরীর মূল্যবান ধন-রত্ন লুন্ঠন শেষে রাজবাড়ীতে এসে ভীড় জমাল। রাজার বিশ্বাস ঘাতক বন্ধু হেরি ইংলিশের আদেশে তারা রাজাকে বন্দী করে ফেলল।

ইংরেজ লুটেরাদের হাতে রাজা বন্দী হওয়ার পর তাঁর প্রাসাদেও লুণ্ঠন চলল। রাজ কোষাগার এবং রাজ পরিবারের বিখ্যাত সোনার মোচা, সোনার কুমড়া, সোনার পাকইড় ছড়া- প্রভৃতি সম্পদ লুট হয়ে গেল। সরল হৃদয় রাজা তাঁর বন্ধু হেরি সাহেবের এই বিশ্বাঘাতকতায় মুষড়ে পড়লেন। কিন্তু অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া তাঁর আর করার মতো কিছুই ছিল না। ইংরেজদের হাতে তাঁর আত্মসমর্পণের ফলে অস্তমিত হয়ে গেল সোনার জৈন্তিয়ার স্বাধীনতার সোনালী সূর্য্য। এ সূর্য্য আর কখনোই উদিত হয়নি। হায়! মানবসভ্যতার এক বিস্ময়কর লীলাভূমি, ভূ-স্বর্গ জৈন্তিয়ার পতন হল অত্যন্ত দীনতা ও হীনতার সঙ্গে।

হেরি সাহেবের নির্দেশে বন্দী রাজাকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হল ইংরেজ তস্কররা। তখন জৈন্তিয়ার রাজধানীতে যে মর্মভেদী দৃশ্যের অবতারণা হয় তা ভাষায় বর্ণনাতীত। জৈন্তিয়াবাসী কয়েকটি গ্রাম্য গানের মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করে আসছে সেই দুঃখের দিনের করুণ কাহিনী। একটি গান নিম্নরূপ-

মুই কই যাউম রে কোথায় গেলে তরী
হাকিম হৈলা হুকুমদার পেদা প্রাণের বৈরী
রে মুই কই যাউম রে
বাট্টি রুট্টি ইন্দ্র সিং মুখে রেখা দাড়ি
রে মুই কই যাউম রে

কথিত আছে যে, বন্দী রাজাকে নিয়ে সিলেট যাওয়ার পথে হাজার হাজার জৈন্তিয়াবাসী ধূলায় লুটিয়ে শোক প্রকাশ করে এবং রাজার কাছে এসে অনুনয় করে বলে- হে রাজন! আমাদেরকে যুদ্ধের হুকুম দিন। আমাদের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও আপনাকে মুক্ত করব। আমাদের প্রাণ থাকতে আপনাকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া কার সাধ্য? কিন্তু রাজা তখনও তাদেরকে শান্ত ভাবে প্রবোধ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাজা জৈন্তিয়াবাসীকে খুবই ভালবাসতেন। তাঁর জন্য হাজার হাজার জৈন্তিয়াবাসীর রক্তক্ষয় হোক- এটা তিনি চাননি। তাই নিজের পরাজয়কেই তিনি মেনে নিলেন। জৈন্তিয়ার রাজার এই পরাজয় নিয়ে স্থানীয় ভাষায় আরেকটি লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে-

হেরি সাহেব বাহাদুর……
বিনা দোষে মাইলরে সোনার জৈন্তাপুর।
ছাতক তনে আইল হেরি যাইত বদরপুর
ছিলট গিয়া জিকার করে জৈন্তা কতদূর?
বিনা দোষে মাইলরে সোনার জৈন্তাপুর।
ছাবাল বয়সী ইন্দ্র সিং মুখে রেখা দাড়ী
বন্দী করি থইল নিয়া মুরারী চান্দর বাড়ী।
হি দিন থাকি আন্দাইর অইল সোনার জৈন্তাপুর
বিনা দোষে মাইলোরে সোনার জৈন্তাপুর।

ইংরেজরা রাজেন্দ্র সিংহকে সিলেটে এনে জমিদার মুরারী চাঁদের বাড়ীতে গৃহবন্দী করে রাখে এবং তাঁর সকল ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। এই সম্পত্তির মূল্য ছিল তৎকালীন সময়ের দেড় লাখ টাকা। মুরারী চাঁদের বাড়ীর যে টিলার ওপরে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখানে এখন এম.সি. কলেজের অধ্যক্ষের বংলো অবস্থিত। এই টিলাটিকে একসময় বলা হতো থেকারে টিলা। সিলেটের প্রথম ইংরেজ রেসিডেন্ট উইলিয়াম মেকপীস থেকারের নামে এই টিলাটির নামকরণ হয়েছিল। রাজেন্দ্র সিং তাঁর বাকী জীবন কাটিয়েছিলেন এখানেই। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে গৃহবন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি।

ইংরেজরা জৈন্তিয়ার রাজাকে পার্বত্য ১২ পুঞ্জিতে রাজত্ব করার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষোভে ও অভিমানে রাজা এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ফলে ইংরেজরা জৈন্তিয়ার এই পার্বত্য অংশকেও তাদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে। ঐ সময়ে পার্বত্য খাসিয়ারা তীর-ধনুক নিয়ে কিছুদিন প্রতিরোধ চালিয়ে যায়। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে তারা বেশীদিন টিকতে পারেনি। তাই শেষ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলেও উড়ল ইংরেজ পতাকা- ইউনিয়ন জ্যাক। আর এভাবেই সমাপ্তি ঘটল এক গৌরবময় সভ্যতার পথচলার ইতিহাসের।

জনশ্রুতি আছে যে, জৈন্তিয়া দখলের পূর্ববর্তী সময়ে ক্যাপ্টেন হেরি ইংলিশ ইংরেজ সরকারের কাছে নরহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিল ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

x
English version