///

পাঁচঘণ্টা সেবা শুশ্রূষা করেও বাঁচাতে পারলেন আহত চিল পাখিকে

25 mins read

ধর্মপাশায় মেহগণি গাছ থেকে পড়ে আহত চিল পাখিটিকে পাঁচঘণ্টা সেবা শুশ্রূষা করেও বাঁচাতে পারলেন না নবী হোসেন৷

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে থাকা একটি মেহগণি গাছের উপর থেকে নীচে পড়ে আহত হয় একটি চিল পাখি। ঘটনাটি ঘটে রবিবার(২২) জানুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টার দিকে। আহত ওই পাখিটিকে উদ্ধার করে প্রাণির মায়ায় মমতার টানে প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাইয়ে পাঁচঘন্টা সেবা শুশ্রূষা করেও শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচানো গেল না সেই চিল পাখিটিকে। ওইদিন বেলা আড়াইটার দিকে এই পাখিটির মৃত্যু হয়। পাখিটির এই মৃত্যুতে মনে ভীষ দাগ কাটে সেবা শ্রশ্রূশার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি নবী হোসেনের(৪০)। তাঁর বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার সদর ইউনিয়নের নলগড়া গ্রামে।পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে তিনি পড়াশুনা করেছেন মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। পাখিটির প্রতিটি তাঁর এই অকৃত্রিম মমত্ববোধের বিষয়টি স্থানীয় মানুষজনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার ঝড় বইছে।

ধর্মপাশা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কার্যালয়টিতে ১৩জন লোকবল থাকার কথা থাকলেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, দুইজন উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, একজন উচ্চমান সহকারী, দুইজন অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর ও একজন হিসাব সহকারি কর্মরত আছেন। এমএলএসএস পদটি দীর্ঘবছর ধরে শূন্য রয়েছে। পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে শিশু বয়সে উপজেলার সদর ইউনিয়নের নলগড়া গ্রামের বাসিন্দা নবী হোসেন(৪০) ফরমায়েশির কাজ করে আসছেন। উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের স্টাফদের আর্থিক সহায়তায় চলে তাঁর দুই ছেলে এক মেয়ে,স্ত্রী ও মাসহ ছয় সদস্যের সংসার।

নবী হোসেন বলেন, মানুষ হিসেবে আমাদের যেমন প্রাণ আছে, সংসার আছে, বাঁচার অধিকার আছে ঠিক তেমনি পাখিরও নিরাপদ বসবাস ও সংসার রয়েছে। রবিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে থাকা একটি মেহগনি গাছের উপর থেকে একটি চিল পাখি পড়ে আহত হয়। চিল পাখিটিকে দেখে আমার মধ্যে এই পাখিটির প্রতি মায়া জন্মে যায়। আমি চিল পাখিটিকে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় নিয়ে যাই। সেখানে থাকা প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শে আমি চিল পাখিটিকে ওষুধ ও পানি খাইয়েছি। আমাদের অফিস ( উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কার্যালয়ের) বারান্দায় রেখে ওইদিন প্রায় পাঁচঘন্টা ধরে সেবা শুশ্রূষা করেও এই পাখিটিকে আমি বাঁচাতে পারিনি। এই পাখিটির মৃত্যুতে আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। পাখিটিতো মরে যাওয়ার পর ভাবলাম, এই মৃত পাখিটিকে যদি যত্রতত্র ফেলে দেই তাহলে এটি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াবে। এতে অনেকেই অসুখ বিশুখে আক্রান্ত হতে পারে। এসব চিন্তা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন একটি পুকুর পাড়ে মাটি গর্ত করে মৃত চিলটিতে আমি মাটিচাপা দিয়েছি।

উপজেলার ধর্মপাশা সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা ব্যবসায়ী সোহান আহমেদ বলেন, আমাদের ইউনিয়নের নলগাড়া গ্রামের বাসিন্দা নবী হোসেন পড়াশুনা কম করলেও তাঁর চিন্তা চেতনা অনেক উন্নত। চিল পাখিটিকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সেবা শুশ্রূষা করেছেন। পাখিটি না বাঁচলেও নবী হোসেনের কাছ থেকে পাখির প্রতি মমত্ববোধ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। নবী হোসেন মৃত চিল পাখিটিকে মাটিচাপা দেওয়ায় পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

ধর্মপাশা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মানবেন্দ্র দাস বলেন, নবী হোসেন শিশু বয়স থেকেই আমাদের কার্যালয়ে ফরামেশির কাজ করে আসছেন বলে জানতে পেরেছি। পরিবারটি দরিদ্র হওয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণসহ আমাদের সবার আর্থিক সহযোগিতায় তাঁর সংসার চলে। আহত চিল পাখিটির প্রতি তাঁর এই মমতা দেখে ঘটনাটি আমার হৃদয়কে খুব নাড়া দিয়েছে। চিল পাখিটিকে সুস্থ করে তুলতে তিনি পাণপণ চেষ্ঠা করেছেন। কিন্তু সেটি উদ্ধার করার পাঁচঘন্টা পর মারা যায়। যার জন্য ওইদিন কোনো কাজে্ই তাঁর মন বসেনি। পাখিটি মারা যাওয়ায় সে খুবই মর্মাহত হয়েছে।

উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মবিন হাই বলেন, চিল পাখিটি দেশীয় প্রজাতির। আহত ওই চিল পাখিটিকে আমরা চিকিৎসা দিয়েছি। শুনেছি পাখিটির মৃত্যু হয়েছে। তবে যিনি পাখিটিকে আহত অবস্থায় নিয়ে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন তিনি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। তিনি আরও বলেন, নানাবিদ কারণে আগের তুলনায় এখন পাখির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। পাখির বসবাসের জন্য অভয়াশ্রম নেই বললেই চলে। প্রতিটি পাখির নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থা করা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version