//

পানের বাজারে দাম কম, কষ্টে খাসিয়া চাষিরা

21 mins read

২০ বছর আগেও খাসিয়া পানের কুড়ি বিক্রি হয়েছে হাজার টাকায়। ২০২২ এক কুড়ি পান বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়।

পানের দাম কম পাওয়ায় অর্থকষ্টে পড়েছেন খাসিয়া (খাসি) পান চাষিরা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার প্রায় অর্ধেক দামে পান বিক্রি করতে হয়েছে। অনেক বছর ধরে ভরা মৌসুমেও পানের মূল্য এতটা কম হয়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে হিমশিম খেতে হচ্ছে খাসিয়া পান চাষিরা।

২০ বছর আগে থেকেই জুন-জুলাই মাসে খাসিয়া পানের কুড়ি বিক্রি হয়েছে হাজার টাকায়। ২০২২ একই সময়ে এক কুড়ি পান বিক্রি হয়েছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। পানের উৎপাদন খরচ ও জীবন যাপনের ব্যয় বৃদ্ধির এই সময়ে পানের যথার্থ দাম না পাওয়ায় পানচাষিরা হতাশ, উদ্বিগ্ন।

খাসি নেতা, পান চাষি ও পান ব্যবসায়ী সূত্রে জানায়, মৌলভীবাজারে ছোট বড় ৬৫টি খাসিয়া পুঞ্জি (ক্ষুদ্র জাতি সত্তার গ্রাম) আছে। পুঞ্জির প্রায় ২৫ হাজার লোকের জীবিকার প্রধান উৎস হচ্ছে খাসিয়া পান চাষ। পান চাষ ও বিক্রি ব্যাহত হলে তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়ে। উৎপাদন ভালো হলেও পানের যথার্থ দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। করোনার বছর গুলোতেও জুন-জুলাই মাসে এক কুড়ি পান বিক্রি হয়েছে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায়। ২০০০ সালেও এক কুড়ি পান বেঁচে চাষিরা পেয়েছেন হাজার টাকা। কিন্তু এবার একই সময়ে এক কুড়ি পান বিক্রি হয়েছে গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ১৪৪ টি পানে এক কান্দা। ২০কান্দায় এক কুড়ি। এখন উৎপাদন খরচ, নিত্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। কিন্তু খাসিয়া পানের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। পান চাষিরা উৎপাদিত পানের সঠিক দাম পাচ্ছেন না। জীবনধারণই কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁদের।

লাউয়াছড়া পুঞ্জির একটি পান জুমের (পানখেত) মালিক পান চাষি সাজু মারচিয়াং বলেন, এবার জুন থেকে প্রায় অক্টোবর মাস পর্যন্ত পানের কুড়ি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি। গত বছর একই সময়ে ১ হাজার থেকে ২হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এখন নভেম্বর থেকে পানের দাম কিছু বাড়ছে। ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কুড়ি। কিন্তু এখনতো শীতকাল, মৌসুম শেষ। পান নাই। অনেক কষ্ট করে চলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের সরকারি ঋণ পাওয়ারও সুযোগ নেই। অনেকেই মহাজনের কাছে ঋণে আবদ্ধ হচ্ছেন। মহাজনকে পানের মৌসুমে বাজার মূল্য থেকে ২০০-৩০০ টাকা কমে কুড়ি দিতে হবে।

পানের দাম কমায় গত অক্টোবর মাসে পুঞ্জির মান্ত্রীরা (পুঞ্জিপ্রধান) কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজারে মতবিনিময় সভা করে। সভায় অনেক গুলো কারণকে যাচাই-বাছাই করে দেখেছেন তাঁরা। কারণের মধ্যে মনে করছেন খাসিয়া পানের জায়গায় বাংলা পানের বিক্রি বৃদ্ধি, আড়তদারদের সিন্ডিকেট, জৈন্তাপুর, জাফলং ও গোয়াইনঘাটের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় খাসিয়া পানের অনুপ্রবেশ, খাসিয়া পান বিদেশে রপ্তানি না হওয়া ইত্যাদি। পানের সংকট থেকে উত্তরণে আগামী জানুয়ারি থেকে পান বিক্রির প্রথাগত পদ্ধতির আড়তের উপর নির্ভর না করে নিজেদের মধ্য থেকে খাসিয়া পানের ব্যবসায়ী ও আড়তদার তৈরি করার কথা ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে আগের থেকে পানের দাম কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন কমে গেছে। ভরা মৌসুমে একজন চাষি যেখানে দুই কুড়ি পান পেতেন। এখন পান এক কুড়ি।

খাসিয়া পানের পাইকার রাখাল বৈদ্য বলেন, কাঁচামালের গ্যারান্টি নেই। দাম কোনো সময় বাড়ে, কোনো সময় কমে। দেশের অর্থনীতির ওপরও নির্ভর করে। কোনো সময় লাভ অয় (হয়)। কোনো সময় লস।

শ্রীমঙ্গলের পানের আড়তদার আরব আলী বলেন, পানের খাওয়া কমেছে, ফসলও ভালো হওয়ায় আমদানি বেশি। এজন্য এবার চাষিরা প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না।

পানচাষি, খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি এবং মাগুরছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী জিডিশন প্রধান সুচিয়াং বলেন, দাম না মেলার কারণ গুলো জানার চেষ্টা করছি। জানুয়ারি থেকে নিজেরা ব্যবসা, আড়তের চিন্তা করছি। পানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কিন্তু কম দামের কারণে গোবর-সার কেনা সম্ভব হয়নি। সার না দেওয়ায় সামনের বছর উৎপাদন কেমন হবে, বলা মুশকিল। পুঞ্জির ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দরকার। রেশন, নয়তো বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version