/

বাংলাদেশের অর্থনীতির ট্রাম্পকার্ড

25 mins read

করোনা মহামারিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সূচকের চরম বিপর্যয় আমাদেরকে এখনো চমকে দেয়। পর্যটনশিল্পে মহামারির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখেছি আমরা। মহামারি-পরবর্তী সময়ে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশ যখন প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, তখন বাধল নতুন সংকট । রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। বিশ্ববাজারে আবারও ভয়াবহ সমস্যার আভাস এল এবং তা সত্যিও হলো। পশ্চিমাদের একের পর এক নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে থামাতে পারেনি। বরং তার বিপরীতে রাশিয়ার দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় সম্পূর্ণ ইউরোপ, আমেরিকা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। শুরু হলো দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক-সংকট। যুদ্ধের প্রায় এক বছর হতে চলেছে। এখনো সেই সংকট কমার নাম নেই, বরং বেড়েই চলেছে ।

এই মুহূর্তে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ থামার জন্য অপেক্ষা করা নিতান্তই কোনো কাজে দেবে না । আমরা শুধু প্রত্যাশাই করতে পারি। এমন অবস্থায় আমাদের দেশের অর্থনৈতিক খাতকে শক্তিশালী করতে ‘পর্যটনশিল্প’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেহেতু পর্যটনশিল্প বিশ্বের সব দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য একটি খাত, সেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালকবৃন্দ এই দিকটায় একটু আলাদা নজর দিতেই পারেন। সমস্যা হলো, আমাদের এই খাতে ব্যবস্থাপনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো নয়। পত্রপত্রিকায় মাঝেমধ্যেই ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায় । শিকারও বেশি হন বিদেশি নাগরিকরা। বহির্বিশ্বে এতে এই খাতের পাশাপাশি দেশেরও ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। মাথায় রাখা প্রয়োজন, ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশ, যারা বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাদেরকেও আর্থিক এবং খাদ্যসংকট ঘিরে রেখেছে। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানোর মতো পরিস্থিতি নেই।

আমাদের দেশে অসংখ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রয়েছে। সিলেট, বান্দরবান, কক্সবাজার, সুন্দরবন, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। বাংলাদেশের সবুজে আচ্ছাদিত ফসলের খেতও ভ্রমণপিপাসুদের মনে আনন্দের রং ছড়ায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণ আঁকাবাঁকা বেয়ে চলা পানির রেখা। উত্তপ্ত রোদে যেমন সিলেটের পাথরগুলো ঝিকঝিক করে ওঠে, তেমনি আবার বৃষ্টিভেজা সকালে দেখা যায় পাহাড়ের অসাধারণ দৃশ্য। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে মানুষ সূর্যকে খুব কাছ থেকে পেয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। এই সবই আমাদের জাতীয় সম্পদ। অর্থনৈতিক মানদণ্ডকে এই মুহূর্তে অনেক বেশি শক্তিশালী করতে না পারলেও পর্যটন খাত অন্তত ধসে পড়া থেকে বাঁচাতে পারবে ।

পৃথিবীতে পরাশক্তিগুলোর দিক বা বলয় পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী আভাস আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি । রাশিয়ার বলয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের আনাগোনা বেড়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে কয়েক দফায় অস্ত্রও কিনেছে। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এলাকা নিয়ে রেষারেষি কখনো শেষ হয়নি, হবেও না। তবে ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হওয়ার পরবর্তী সময়গুলোতে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব কিছুটা কমেছে। মূলত জি-২০ অর্থনৈতিক জোটের বিপরীতে আভিজাত্য বাড়াতে ব্রিকসের উত্থান সে কথা পরিষ্কার ।

যদি বিশ্ব বলয়ের বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন এর মধ্যে হয়েই যায়, তবে সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হবে; তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, বিশেষ করে খাদ্য আমদানিতে আমরা ভারতের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। অথচ ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। আর আমাদের রপ্তানিশিল্পের সবচেয়ে বড় খাত আরএমজি সেক্টর বা তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ-আমেরিকায় । অর্থাৎ আমদানি ও রপ্তানির দুটির ক্ষেত্রই ভিন্ন দুটি বলয়ে প্রায় একমুখী । সরকার আশার বাণী শোনালেও, বাজার বলছে ভিন্ন কথা । আমাদের অর্থনৈতিক সূচক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। হতে পারে সরকার এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনো জটিলতা রয়েছে। বাজারের এই ভারসাম্যহীনতা আগামী নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্য বলছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের অবদান ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই তথ্য গত বছরের। করোনাকালীন এই খাত ব্যাপকভাবে লোকসানের শিকার হয়। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এবং প্রয়োজনীয়তাও এখনই। অতএব পর্যটন খাতের ব্যবস্থাপনার সঠিক মানদণ্ড আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে পারে। পর্যটকের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, তাদের চাহিদা কিংবা প্রয়োজন মেটানোর সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ট্রাম্পকার্ড হতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

x
English version