

গোয়াইনঘাটে পেট্রোল ঢেলে ঘরে আগুন, বের হওয়ার পর জবাই করে হত্যা
আগেই দেয়া হয়েছিল রাস্তায় ব্যারিকেড। এরপর বাড়ি ঘেরাও করে শতাধিক লোক। ভয়ে ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেন বাড়ির লোকজন। পেট্রোল ঢেলে ঘরে লাগানো হয় আগুন। ঘরের ভেতরেই ছিলেন আব্দুল কাদির। জানালা দিয়ে তিনি বাইরে আসেন তখনই হামলাকারীরা তাকে ধরে ফেলে এবং কাঁঠাল গাছের নিচে নিয়ে এলোপাতারি কুপিয়ে শুইয়ে দেয় মাটিতে। তারপর গলায় চালায় ধারালো রামদা। এমন লোমহর্ষক, বর্বর ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার দক্ষিণ লাবু গ্রামে।
ঘটনায় হতবাক উপজেলাবাসী। পুলিশ নামে অভিযানে। ২৪ ঘন্টায় গ্রেপ্তার করা হয় ১২ জনকে। পুলিশের ৫টি টিম অভিযান পরিচালনা করছে। পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে দক্ষিন লাবু গ্রাম। আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা অতংঙ্কে রয়েছে। কাদিরের পিতা আব্দুল খালিক, মা হাসিনা বেগম, স্ত্রী সাবিনা বেগম ও চাচাতো ভাই শহীদ আহমদকে নির্মম ভাবে কোপানো হয়। তারা বর্তমানে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মুমুর্ষ অবন্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। নিকট আত্মীয়রা জানিয়েছেন তাদেরও অবস্থা ভাল নয় যে কোন মুহুত্বে আরও ১/২ মৃত্যু হতে পারে ৷ ঘটনাটি ঘটে ১৫ জুলাই শুক্রবার রাত ৮টায়। গোয়াইনঘাট উপজোলার সদর ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা দক্ষিণ লাবু গ্রামে।
উপজেলার সদর ইউনিয়নে গ্রাম হলেও দূর্ঘম ও সীমান্তবর্তী হওয়ার সেখানে অপরাধীদের সংখ্যা বেশি। সীমান্তে চোরাচালান সহ প্রতিনিয়ত নানান ঘটনায় জড়িত গ্রামের মানুষ জন ৷
প্রায় চার বছর পূর্বে গোয়াইন গ্রামের নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় এই গ্রামে। ঐ হত্যার ঘটনাটি সংগঠিত হয় আব্দুল কাদিরের বাড়ির নিকটবর্তী স্থানে। যার কারণে নুরুল হত্যার ঘটনায় কাদির সহ গ্রামের বেশির ভাগ মানুষকে আসামি করা হয়েছিল।
ঐ মামলার চার্জশিট দাখিলের পর আদালতে মামলাটি এখনও চলমান আছে। পূরুষ শূন্য গ্রামের কয়েক জন মহিলা জানান- নুরুল হত্যাকাণ্ড নিয়ে গ্রামের লোকজন আসামি হওয়ার পর সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে মামলা চালাচ্ছিলেন। এই মামলা দেখভাল করতো নিহত আব্দুল কাদির সহ তার পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি মামলার খরচ বহন নিয়ে গ্রামের আতাফুল, শামসুদ্দিন, লুৎফুর সহ কয়েক জনের সঙ্গে বিরোধ চলছিল আব্দুল খালিকের পরিবারের সাথে । ঘটনার দিন সহ গত তিন মাস ধরে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। গ্রামের ভেতরে উত্তেজনা দেখা দেয়।
সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যায় গোয়াইনঘাট সদর হতে খেয়াঘাটে ফিরে আব্দুল কাদির। খেয়াঘাটে নামার পর মামলার খরচ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে গ্রামের কয়েকজন লোকের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে আতাফুল, শামসুদ্দিন, লুৎফুর, কনা মিয়া, মফিজ উদ্দিন, আব্দুল রহিম, আপ্তাফুল সহ কয়েক জন আব্দুল কাদিরকে খেয়াঘাট এলাকায় মারধর করে। পাল্টা হামলাও করে আব্দুল কাদির ও তার লোকজন। এই ঘটনার পর আব্দুল কাদির দক্ষিণ লাবু গ্রামের নিজ বাড়িতে চলে যায়।
ঘটনার পর রাত ৮টার দিকে আতাফুল, শামসুদ্দিন, লুৎফুর, কনা মিয়া, মফিজ উদ্দিন, আব্দুল রহিম, আপ্তাফুলের নেতৃত্বে গ্রামের শতাধিক মানুষ আব্দুল কাদিরের বাড়ি ঘেরাও করে। বাড়ী ঘেরাও করার পূর্বে তারা গ্রামের পূর্বদিকে পরগণা মাদ্রাসা সড়কে এবং পশ্চিম দিকে তারা কামালের বাড়ির সামনে ব্যারিকেড দেয়। বাহিরের কাউকে দক্ষিণ লাবু গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
দেশিয় অস্ত্র সেল, বল্মম, ঝঁটা, রামদা, লাঠিসোঁটা নিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষ পাহারায় বসে। আর বেশির ভাগ লোক গিয়ে ঘেরাও করে আব্দুল কাদিরের বাড়ি। ঐসময় আব্দুল কাদির, তার পিতা আব্দুল খালিক সহ পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ছিলেন। বাড়ি ঘেরাও করার পর আব্দুল কাদির ও তার পরিবারের সদস্যরা দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরেই অবস্থান নেন। তারা ঘর হতে বের হওয়ার ডাক দেয়৷ অবস্থা বেগতিক দেখে তারা ঘর হতে বের না হলে একপর্যায়ে হামলাকারী লোকজন বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। প্রেটেল নিয়ে এসে ঘরের চারদিকে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে। গোটা বাড়িতেই দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। ঘরের ভেতর থেকে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও বাড়ির রাস্তায় দু’দিকে ব্যারিকেড থাকার কারণে কেউ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেননি।
বাড়ির বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানিয়েছে- ঘরের চারদিকে আগুন থাকায় জানালা খুলে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে প্রথমে বের হয় আব্দুল কাদির। হামলাকারীরা তাকে ধরে ফেলে। এলোপাতারি আক্রমন করে একপর্যায়ে কাঁঠাল গাছের নিচে নিয়ে মাটিতে শুইয়ে রামদা দিয়ে ঠান্ডা মাথায় জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ দৃশ্য দেখে কাদিরের পিতা আব্দুল খালিক, মা হাসিনা বেগম ও স্ত্রী সাবিনা বেগম দরজা খুলে দৌড়ে আসেন। তাদেরকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতারি কোপানো হয়। তাদের চোখের সামনেই আব্দুল কাদিরকে গলা কেটে হত্যা করল ঘাতকরা। তিনি আরও জানান, একদিকে ঘরে আগুন জ্বলছিল, অন্যদিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে কোপানো হচ্ছিল।
বাঁচার জন্য চিৎকার করা হলেও কেউ এগিয়ে আসতে পারেননি এবং কাউকে আসতে দেওয়া হয়নি। ফলে দূর থেকে দাঁড়িয়ে স্থানীয় লোকজন দর্শকের মত ঘটনাটি দেখা ছাড়া অস্ত্রধারীদের সাথে কিছুই করার ছিল না।
স্কুলছাত্রী বেগম জানায়- ঘটনার সময় মনে হয়েছিল কিয়ামত নেমে এসেছিল ঐ পরিবারে। গোটা বাড়িতেই দাউ দাউ করে জ্বলছিল আগুন। আর যারাই আগুন হতে বাঁচতে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন তাদের ওপর হামলা চলে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। এতে ঘটনাস্থলে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত কাদিরের পিতা, মাতা, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সাবিনা ও বোন নাজমা গুরুতর আহত হন।
খবর পেয়ে দূর্ঘম রাস্তাপাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলে একঘণ্টা পর পুলিশ পৌছালে হামলাকারীরা চলে যায়। পুলিশ আসার পর আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পুলিশ নিহত কাদিরের লাশ উদ্ধার করে। কাদিরের স্বজনরা জানিয়েছেন- পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক বাহিরে এবং রাস্তায় পাহারা বসিয়ে ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারা ঘরের চারদিকে পেট্রোল ঢেলে ঘরে আগুন জ্বলিয়ে দেয়৷ আব্দুল কাদির সবাইকে বাচাতে একাই ঘর হতে বের হয়ে যায়। আমরা পিছু পিছু বের হয়ে দেখি ওরা আব্দুল কাদিরকে ধরে নিয়ে জবাই করছে এবং উল্লাস করছে ৷ আমরা বার বার হাতে-পায়ে ধরে জীবন ভিক্ষা চাইলেও মন গলেনি হত্যাকারীদের। উল্টো ওরা আমাদেরকেও কোপায়।
এই ঘটনার নির্মমতা জানার পর গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের কয়েকটি টিম তাৎক্ষণিক অভিযান শুরু করে। পুলিশের একটি টিমকে মোতায়েন করা হয় নিহত আব্দুল কাদিরের বাড়িতে। রাত হতে শুরু হওয়া অভিযানে গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে।
গোয়াইনঘাট থানার ওসি কে এম নজরুল ইসলাম শনিবার বিকালে প্রতিবেদককে জানান, পুলিশের ৫টি টিম অভিযানে রয়েছে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এর বাহিরে সাদা পোশাকে পুলিশের কয়েকটি টিম রয়েছে। তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশ এই ঘটনায় দোষীদের ছাড় দেবে না। এলাকায় যাতে পরিবেশ স্বাভাবিক থাকে সে কারণে পুলিশ মোতায়েন করেছি।
অপরদিকে- গতশনিবার দুপুরে সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল ও শাহরিয়ার বিন সালেহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ আফজাল জানান, এই ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। যারা প্রকৃত আসামি তাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
নিহতের লাশ সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার বিকালে কাদিরের লাশ পৌঁছে বাড়িতে। বাদ আসর স্থানীয় পরগণা বাজার মাদ্রাসায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও বসত ঘরে আগুন দেওয়ার প্রধান আসামি লুৎফুর সহ ১২ জনকে আটক করে এবং অপরাধের সঙ্গে ব্যবহৃত অস্ত্র জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হল- লাবু গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে শাহীন, হাসান রেজার ছেলে লুৎফুর, আবুল খায়েরের ছেলে বেলায়েত হোসেন, সোনা মিয়ার ছেলে কাজী কামাল, আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুন নূর, কুতুব উদ্দিনের ছেলে জসীম উদ্দিন, আব্দুস সোবাহানের ছেলে হাবিবুল্লাহ মিসবাহ, আব্দুস সালামের ছেলে অলিউল্লাহ, আব্বাস উদ্দিনের ছেলে আলী হোসেন ও আলম হোসেন। তাৎক্ষনিক ভাবে বাকিদের নাম জানা যায়নি।


