////

‘দ্যা মাস্টারমাইন্ড’ ফলিক-আবু

40 mins read

অত্যাচারী রাজা গৌর গোবিন্দকে শায়েস্তা করতে সাধকপুরুষ হযরত শাহজালাল (রাহ.) যখন সিলেটের পথে তখন তাকে রুখে দিতে সুরমা নদী থেকে সকল নৌকা সরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো যাতে তিনি সিলেটে প্রবেশ করতে না পারেন। সেই সুরমা নদী আজও আছে, আজও এটি সিলেটকে আলাদা করে রেখেছে সারা দেশ থেকে। সাতশ বছর পরও গৌরগোবিন্দের সে কৌশল আজও টিকে আছে, যদিও এখন আর নৌকা দিয়ে নদী পেরোতে হয় না। সুরমার বুকে এখন বেশ কয়েকটা ব্রিজ হয়েছে, সিলেটকে থমকে দিতে এখন ব্রিজগুলোতে প্রতিবন্ধক তৈরি করতে পারলেই হয়। ব্রিজগুলো আটকে দিলেই মূলত সিলেট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সারা দেশ থেকে। গৌরগোবিন্দের কৌশলকে পুঁজি করে প্রায়ই সিলেটকে থমকে দেন পরিবহন শ্রমিকরা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে আর কোথাও এত এত ঘন ঘন পরিবহন ধর্মঘট হয় না। সিলেটের ভৌগলিক সুবিধার কারণেই পরিবহন শ্রমিকরা সাধারণকে জিম্মি করার এ সুযোগটি পেয়েছেন। ছোটখাট অজুহাতে যখন-তখন তারা পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেন। কারণ সিলেটকে ‘বন্দি’ করার মন্ত্রটা তো তাদের জানাই আছে। এ মন্ত্র জপেই সিলেটে পরিবহন নেতারা হয়ে উঠেছেন একেকজন দানব। তাদের দাপটের কারণে রাজনৈতিক নেতারাও যেনো অসহায়। ধর্মঘটের ডাক দিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের অন্যায় আবদারও মিটিয়ে নিতে থাকেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটে পরিবহন সেক্টরের দাপটের শুরু সেলিম আহমদ ফলিকের হাত ধরে। সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজিস্ট্রেশন নং : ১৪১৮) সাবেক সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতির মাঠেও আনাগোনা রয়েছে তার। সব মিলিয়ে তার ভালো প্রভাব। পরিবহন শ্রমিকরা এমন একজন ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নিতে মোটেও দ্বিধা করেনি। তবে এ পরিচয় একদিনে গড়ে তুলেননি সেলিম আহমদ ফলিক। জকিগঞ্জ লাইনে হেল্পার হিসেবে যার যাত্রা শুরু কালে কালে তিনিই পরিবহন সেক্টরের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেন। যখন বুঝে নেন পরিবহন সেক্টরে তাকে আর টেক্কা দেওয়ার কেউ নেই, বেপরোয়া হয়ে উঠেন। অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ায় আবদুল মান্নান নামের এক পরিবহন নেতার বাস রাস্তায় নামতে দেননি। টার্মিনালে থেকেই নষ্ট হয় সে বাসটি। সেলিম আহমদ ফলিক বুঝিয়ে দেন যে, তিনি কারো উপর নাখোশ হলে কী পরিণতি হতে পারে। সেলিম আহমদ ফলিককে নাখোশ করায় আরও কতজনকে যে মামলা-হয়রানির শিকার হতে হয়েছে তার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। এভাবে আস্তে আস্তে মুঠোয় পুরে নেন সিলেটের পুরো পরিবহন সেক্টর। ‘নেতা’র দানব হয়ে উঠার পাশাপাশি পরিবহন ধর্মঘটের ‘খেলা’ও শুরু হয় তখন থেকেই। এ ‘অস্ত্র’টিকে কাজে লাগিয়ে সড়কে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সেলিম আহমদ ফলিক। এমনকি সড়কের দাপটের জোরে সেলিম আহমদ ফলিক বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সিলেট কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের একটি কোটাও তৈরি করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে চাঁদাবাজি, স্ট্যান্ড শাখা থেকে আয়ে রাতারাতি পকেট ফুলতে থাকে সেলিম আহমদের। নিজের পকেট আর ইউনিয়নের ফান্ড কোনোটিকেই তখন আর তার কাছে আলাদা মনে হত না। শ্রমিকদের শ্রম-ঘামের ২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে- নিকটাত্মীয়ের বিয়েতেও খরচ করেছেন সে ফান্ডের টাকা।

সেলিম আহমদ যখন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন- এরই মাঝে সিলেটের পরিবহন সেক্টরে যুক্ত হয় আরও একটি নাম-আবু সরকার। এক আওয়ামী লীগ নেতার ‘কাছের মানুষ’ পরিচয়ে পরিবহন সেক্টরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন এক সময়ের তরকারি বিক্রেতা আবু সরকার। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নব্বইয়ের দশকে সিলেটে আসেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় গ্রামের রমাকান্ত দাসের ছেলে রাধিকারঞ্জন দাস। জীবিকার সন্ধানে ট্রাকচালক আবদুল মতিনের হেলপার হিসাবে একসময় প্রবেশ করেন পরিবহন জগতে। ডাকতে সুবিধা হবে বলে আবদুল মতিনই রাধিকা রঞ্জনের নাম রাখেন আবু। সেই থেকেই তিনি পরিচিতি পান আবু নামেই। দাপট তৈরির জন্য সিলেট নগরীর টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সাথেও নিজেকে জড়িয়ে নেন। টিলাগড়কেন্দ্রিক এক নেতার নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্মও করতে থাকেন। ওই নেতার আত্মীয় পরিচয় দেওয়ার জন্য নিজের নামের সাথে যুক্ত করেন ‘সরকার’ পদবিও। রাধিকারঞ্জনের পরিচয় হয় আবু সরকার। ধীরে ধীরে দাপট বাড়তে থাকে আবু সরকারের। এক সময় নেতা হয়ে উঠেন ট্রাক শ্রমিকদের, সভাপতিও হন সিলেট জেলা ট্রাক পিকআপ কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের।

নিজের সীমানা পেরিয়ে আবু সরকার ‘নেতাগিরি’ ফলাতে থাকেন অন্য জায়গাতেও। ২০১২ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে অগ্নিকাণ্ডের যে ঘটনা ঘটে, সে ঘটনায়ও নাম আবু সরকারের। অগ্নিকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে সন্দিগ্ধ হিসেবে সিআইডি তাকে শনাক্তও করে। কিন্তু ‘প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী’ না থাকায় সে যাত্রায় রেহাই পান আবু সরকার। ২০১৭ সালে ‘ধর্মঘট না মানায়’ জেলা আওয়ামী লীগের সে সময়কার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ শফিকুর রহমান চৌধুরীর গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আবু সরকারসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় জেলও খাটেন আবু সরকার। হামলার ঘটনায় জড়িত থাকায় আবু সরকার ও তার অনুসারী ২০ জনকে আজীবন বহিষ্কার করে সিলেট জেলা ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়ন। চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, যে ইউনিয়ন তাকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করে কদিন পর ওই ইউনিয়নেরই সভাপতি হন আবু সরকার।

নিজের শক্তি বাড়াতে এই আবু সরকারকে কাছে টেনে নেন সেলিম আহমদ ফলিক। সিলেট জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক ও সিলেট জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু সরকারের বোঝাপড়ায় রাজপথ হয়ে উঠে সাধারণের জন্য আরও ভোগান্তির। দিন সব সময় এক যায় না। আসে করোনাকাল, দুঃসময়ে ইউনিয়ন থেকে সহযোগিতা না পেয়ে ফুঁসে উঠেন সাধারণ শ্রমিকরা। শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে ফলিকের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালের গেল ২ জুন সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ায় শ্রমিকদের দুই পক্ষ। এ অসন্তোষের কারণে পরে নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে সেলিম আহমদ ফলিকের। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে তিনি হার মানেন ময়নুল ইসলামের কাছে।

সুযোগ বুঝে আবু সরকারও ‘কিক মারেন’ সেলিম আহমদ ফলিককে। আবু সরকার নিজের ‘গুরু’ সেলিম আহমদ ফলিককে বহিস্কার করেন সিলেট বিভাগ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি পদ থেকে। ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর এক সভায় সেলিম আহমদ ফলিককে বহিস্কার করে আবু সরকার নিজে দায়িত্ব নেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির। গল্প কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। সেলিম আহমদ ফলিকের মতো একই পরিণতি অপেক্ষা করছিলো আবু সরকারের জন্যও। ২০২২ সালের ২ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেট জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজিত হন দিলু মিয়ার কাছে। দিলু মিয়া যেখানে ৫ হাজার ৫৯১ ভোট পেয়েছেন সেখানে আবু সরকারের ভাগে জুটে ১ হাজার ৬শ ভোট।

পদ হারিয়ে সিলেটে সড়কের এক সময়ের মাস্টারমাইন্ডরা আপাতত নীরব রয়েছেন। তবে তাদের তৈরি করা মঞ্চটি তেমনই রয়ে গেছে। নেতার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সড়কে তাণ্ডবের অবসান হয়নি। ‘লঙ্কায় গিয়ে তারাও রাবণের মতো দানব হয়ে উঠেছেন। পাঠক কাল থেকে আমরা আপনাদের সেই সব দানবের গল্প শুনাবো।

সূত্র: দৈনিক একাত্তরের কথা পর্ব-১

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version