

টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ও হেমনগর ইউনিয়নে যমুনার পাঁচটি অবৈধ ঘাট থেকে দিনরাত বালু উত্তোলন করায় ৪৫০ কোটি টাকায় নির্মিত একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এখন হুমকির মুখে। দুটি বেড়ি বাঁধেরও একই অবস্থা। এমনকি সোনামুই এলাকায় বেড়িবাঁধের হার্ডপয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানা যায়, টাঙ্গাইলের গোপালপুর, ভূঞাপুর, মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল ও কালিহাতী উপজেলা এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলাকে যমুনার ভাঙন এবং অকাল বন্যা থেকে রক্ষার জন্য পাউবো তারাকান্দি-ভূঞাপুর বাঁধটি নির্মাণ করে। এ বাঁধের নলিন এলাকায় যমুনা নদী বাঁক খেয়ে পূর্ব তীরে সরে আসায় সোনামুই, শাখারিয়া, নলিন ও গোলপেচা অংশ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাউবো তারাকান্দি-ভূঞাপুর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি নতুন করে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করে। এটি এখন মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধকে অধিকতর নিরাপদ করার জন্য নলিনের উত্তরে সোনামুই-পিংনা পর্যন্ত এবং নলিনের দক্ষিণে গাড়াবাড়ী থেকে তারাই পর্যন্ত দুটি পৃথক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বালু খেকোদের উপদ্রবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বেড়িবাঁধ দুটো এখন হুমকির সম্মুখীন।
নলিন বাজারের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, এসব মূল বাঁধ ও সাপোর্টিং বাঁধ থেকে ১০০ গজ দূরে পর পর পাঁচটি অবৈধ বালু মহাল বসানো হয়েছে। রাতদিন ২৪ ঘণ্টা শতাধিক শতাধিক ভেকু দিয়ে নদীর পাড় থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এসব বালু শত শত ড্রাম ট্রাকে করে অনবরত পাচার করা হচ্ছে। এভাবে বাঁধের নিকট থেকে বালু উত্তোলন করায় তৈরি হচ্ছে বিপজ্জনক গর্ত। শাখারিয়া গ্রামের সোহেল রানা জানান, গত বর্ষা মৌসুমে পাউবো বহু চেষ্টা করে নতুন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এবার বালু খেকোরা বেপরোয়াভাবে বালু তুলছে। বন্যার পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব গর্ত থেকেই ব্যাপক ভাঙন শুরু হবে। প্রথমেই দুটি বেড়ি বাঁধ এবং পরে মূল বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধটির ৩ কিলোমিটার বিলীন হয়ে যাবে। ফলে টাঙ্গাইল ও জামালপুরের সাত উপজেলার লাখ লাখ একর জমির ফসলহানি ঘটবে। নদীভাঙনে বহু বাড়িঘর, আবাদি জমি, হাটবাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন হবে।
গোলপেচা গ্রামের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান জানান, একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ বালুঘাট বানিয়ে বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা এতটাই শক্তিশালী যে চোখের সামনে বাঁধের ভয়াবহ ক্ষতির চিত্র দেখা সত্ত্বেও কেউ টুঁ শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না।
হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রওশন খান আইয়ুব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে জানান, বালু খেকোদের জন্য তিন বছর আগে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এসব বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের লোভের কাছে মেরামত করা বাঁধ আবার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি অবৈধ বালুঘাট বন্ধ এবং বালুখেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
নলিন ঘাটে বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত শহীদ ম্যানেজার জানান, তারা মাস বেতনে এখানে বালু তোলার কাজ করেন। পেছনে রয়েছে বড় বড় নেতা। পারলে তাদের নাম লিখুন।
গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বেড়ি বাঁধ নয়, গোপালপুরের সোনামুই ও চরশাখারিয়া এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার রাধানগর ও পিংনা মৌজা রক্ষায় বণ্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩০০ গজ পশ্চিমে বাঁধের যে হার্ড পয়েন্ট সেটিও এখন বালুখেকোদের দরুন হুমকির মুখে। এরা কাউকেই মানছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে জানান, যে কোনো মূল্যে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করতে হবে। নইলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব বাঁধ বিলীন হয়ে যাবে।
গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক জানান, গত মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে অবৈধ বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের সময় একজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে একাধিক ভেকু, ড্রাম ট্রাক আটক এবং জেল-জরিমানা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও অভিযান চালানো হবে।


