//

১৫ দিনেও আসামীদের সন্ধাননেই পুলিশের হাতে, এখন অধরা জৈন্তাপুরে মাসুম হত্যাকারীরা

34 mins read

তুচ্ছ ঘটনায় পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয় সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ছাতারখাই গ্রামের স্কুল ছাত্র মাসুমকে।

গক ৫ নভেম্বর কানাইঘাট উপজেলার চতুল বাজারে দিবালোকে প্রভাবশালীরা পিতার সামনেই ছেলেকে ছুরিকাঘাত করে ও পিটিয়ে হত্যা করে মাসুমকে। হত্যাকান্ডের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও অধরা থেকেই গেল আসামিরা। এই ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চারসৃষ্টি হচ্ছে। ইতোমধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হলেও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।

তবে পুলিশ বলছে আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তাদের খোঁজা হচ্ছে। অন্যদিকে আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আতংঙ্ক উৎকন্ঠায় রয়েছে নিহত মাসুমের পিতা সহ পরিবারের সদস্যরা।

আসামী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক ইউপি সদস্য তফজ্জুল আলী সহ সবার বাড়িও ছাতারখাই গ্রামে এবং নিহত মাসুমের বাড়ীও একই গ্রামে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে পার্শ্ববর্তী কানাইঘাট উপজেলার চতুল বাজারে। যারকারনে আলোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় কানাইঘাট থানায়।

নিহত মাসুম আমিনা হেলালী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র। পড়ালেখার পাশাপাশি সংসারে সুখ ফেরাতে পার্টটাইম সিএনজি (অটোরিক্সা) চালাতো।

ঘটনার শুরু হয় ৪ নভেম্বর। এইদিন স্থানীয় খেলার মাঠে মাসুমের ছোট ভাই জহিরুলের ওপর হামলা চালিয়ে হাত ভেঙ্গে দেয় প্রধান আসামি তফজ্জুলের পক্ষের লোকজন। এ ঘটনার পর মাসুমের পিতা আব্দুল খালিক এলাকার সমাজ পতিদের নিকট বিচারপ্রার্থী হন। কিন্তু তারা কোনো বিচার করে দেয়নি। উল্টো প্রভাবশালী তোফাজ্জুলের পক্ষের জহিরুলের ভাই মাসুমের ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

ঘটনার পরদিন বিকালে নিহত মাসুম চতুল বাজারের ছাতাইরখাই সিএনজি (অটোরিক্সা) ষ্টেশনে যায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রধান আসামি তফজ্জুল সহ অন্যান্যরা মাসুমকে ঘেরাও করে মারপিট শুরু করে। উপযুপরি মারধরের একপর্যায়ে শত শত মানুষের সামনে হত্যাকারীরা ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে রক্তাক্ত করে। এই সময় নিহত মাসুমের পিতা আব্দুল খালেক এগিয়ে এলেও তাকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মাসুমের পিতা আব্দুল খালেককে স্থানীয়রা রক্ষা করে একটি দোকানের ভেতর নিয়ে যান। তারপর প্রভাবশালী তফজ্জুলের পক্ষ মাসুমকে খুন করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানানা, ঘটনার সময় মাসুম ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি। হামলাকারীরা সশস্ত্র ছিল। তারা চতুল বাজারে ভয়ের সৃষ্টি করে এই হত্যাকান্ডটি ঘটায়।

তারা জানান খুনের ঘটনার আগে সশস্ত্র অবস্থায় তফজ্জুল ও তার লোকজন চতুল বাজারের ছাতারখাই সিএনজি ষ্টেশনে মঈন উদ্দিনের দোকানে অবস্থান করে। এর আগেই দোকানের মধ্যে অস্ত্রও মজুত রাখে। এরপর মাসুম অন্য দিনের মত মাসুম দোকানে পান খেতে গেলেই তার ওপর হামলা করা হয়। পরবর্তীতে গুরুত্বর আহত মাসুমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য মেডিকেল নিতে গেলও হত্যাকারীরা সিএনজি গাড়ী আটকে রেখে এবং মাসুমের পিতা খালিকে বেঁধে রাখে ৷ একপর্যায় চতুল বাজারের জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে ঘটনার বেগতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে হত্যাকারী তফাজ্জুল বাহিনী পালিয়ে যায়৷

ছেলে হত্যার ঘটনায় মাসুমের পিতা আব্দুল খালিক বাদী হয়ে ঘটনার পরদিন কানাইঘাট থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু হত্যার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও ২০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হতে পারেনি।

মামলার আসামিরা হল, ছাতারখাই গ্রামের বাসিন্দা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক ইউপি সতস্য তফজ্জুল আলী, বাবুল আহমদের ছেলে রাসেল আহমদ, মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে কবির উদ্দিন, নিজাম উদ্দিনের ছেলে কামরুল ইসলাম, মৃত কুতুব আলীর ছেলে নিজাম উদ্দিন তার ভাই বাবুল আহমদ, আব্দুল জলিলের ছেলে আলমাছ উদ্দিন, আব্দুল মনাইয়ের ছেলে নজরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান ওবইর ছেলে ইমরান আহমদ, আব্দুস সুবহানের ছেলে আলীম উদ্দিন, আব্দুল মনাফের ছেলে মঞ্জুর আহমদ, তফজ্জুল আলীর ছেলে জবরুল, সফর আলীর ছেলে বশির উদ্দিন লাশ মোহন, আব্দুল ওয়াহিদের ছেলে শাহজাহান মিয়া, ভিতরগ্রামের মফিজ আলী মঈন উদ্দিন।

এলাকাবাসী জানান, ঘটনার পর হামলাকারীরা তাদের নিজ নিজ বাড়িতেই ছিল এবং মামলা দায়ের করার পূর্ব পর্যন্ত তারা বাড়িতেই অবস্থান করে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন ? হত্যাকান্ডের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামীরা বাড়ীতে থাকলেও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো আসামিদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে পুলিশে কেউ কেউ সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা আসামিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।

হত্যাকান্ডের ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। আসামিরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে এ ঘটনার প্রতিবাদে সমাবেশের আয়োজন চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। তারা আরও জানান এমন ঘটনা চতুল বাজারে অতীতে কখনো ঘটেনি। প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনায় এলাকায় আতংঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার পরবর্তী পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় বিষয়টি রহস্যজনক হিসেবে দেখছেন তারা।

মামলার বাদী আব্দুল খালিক জানান, আসামি পক্ষের লোকজন তাদের ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে। মামলা তুলে নিতে বিভিন্ন ভাবে তারা চাপ প্রয়োগ করছে নতুবা বেঁচে থাকবে না৷ প্রথমে তার আমার ছেলে জহিরুলের হাত ভেঙ্গে দিলেও তিনি পুলিশের কাছে না গিয়ে সমাজপতিদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রতিপক্ষরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে গ্রামের লোকজন নিষ্পত্তিতে এগিয়ে আসেননি। তিনি বলেন আমার ছেলে খুন হয়েছে। এখন বিচার চাইতে গিয়েও চোখ রাঙ্গানি দেখছি। অথচ পুলিশ নির্বিকার। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পক্ষ থেকে টালবাহানা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে জৈন্তাপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুল করিম জাতীয় দৈনিককে জানান, মাসুম হত্যার ঘটনার পরপরই আসামিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের মোবাইল ট্র্যাকিং করে অভিযান চলছে। পুলিশের তিনটি টিম অভিযানে রয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version