

তখন সিএনজি অটোরিকশা ছিলো না। রাস্তায় চলতো তিন চাকার টু স্ট্রোক। হলুদ কালো রঙের লোহা-কাঠের বডির এ বাহনটির আদুরে নাম ছিলো বেবিটেক্সি। তেমনই এক বেবিটেক্সি চালক ছিলেন সিলেট শহরতলির খাদিমনগর বাহুবল এলাকার মৃত আবদুর রহিমের ছেলে কাজী রুনু মিয়া মঈন। তবে এর আগে আরও গল্প আছে।
রুনু মিয়ার মূল বাড়ি কিন্তু খাদিমনগরে নয়। তার বাড়ি ছিলো সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায়। সীমান্তবর্তী উপজেলার বাসিন্দা রুনু মিয়া এক সময় জড়িয়ে পড়েন চোরাচালানের সাথে। ১৯৭৯ সালে একটি গরুচুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রাম ছাড়তে হয় রুনু মিয়াকে। ঠিকানা হয় সিলেট শহরে। সিলেটে তার কর্মজীবন শুরু হয় দিনমজুর হিসেবে। তারপর রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়েও কিছুদিন জীবিকা নির্বাহ করেন, সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এলাকায় রিকশা চালাতেন তিনি। রিকশা থেকে পরে উঠেন বেবিট্যাক্সির চালকের আসনে। ১৯৯৮ সালে বেবিট্যাক্সি ছেড়ে প্রবেশ করেন টেম্পুর জগতে। সেখান থেকেই উত্থানের শুরু রুনু মিয়ার। ২০০৫ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন সিলেট জেলা টেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের। ১৩২৬ নম্বরে চট্টগ্রাম থেকে নিবন্ধিত এ ইউনিয়নটি বর্তমানে সিলেট জেলা হিউম্যান হলার চালক শ্রমিক ইউনিয়ন নামে পরিচিত।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হওয়ার পরই রুনু মিয়ার জীবনচিত্র পাল্টাতে থাকে। কাঁচা টাকা আসতে থাকে তার পকেটে। শ্রমিকদের শ্রম-ঘামের টাকা দিয়ে শুরু করেন জায়গা-জমির ব্যবসা। স্থানীয় প্রভাবশালী ‘মামা খন্দকারে’র সাথে মিলে এ ব্যবসায় দুহাতে টাকা কামাতে থাকেন। শ্রমিকদের টাকা তো ঢুকছিলোই পকেটে। টাকার দাপটে তার কিছু সঙ্গীসাথীও জুটে যায়। তাদের সহযোগিতায় কবজা করেন পুরো ইউনিয়ন। ২০০৫ সালে সেই যে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তারপর আর পদ ছাড়েননি। মেয়াদ শেষে নির্বাচন না দেওয়ায় কমিটির ৬ সদস্য পদত্যাগও করেন। কিন্তু পদ চলে যেতে পারে এই ভয়ে নির্বাচন দেন না দেড় যুগ হলো। সেই কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক ইনসান আলীকে সঙ্গী করে মাঝে মাঝে অবশ্য পকেট কমিটি গঠন করেন রুনু মিয়া। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদেরও সাহস নেই সাধারণ শ্রমিকের। কাউকেই এ সংগঠনে দাঁড়াতে দিতে চান না রুনু মিয়া। ২০০৫ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় তিনি মকবুল হোসেনকে ইউনিয়ন থেকে বহিস্কার করেন। তার সাথে লড়াই করতে গিয়ে মকবুল হোসেন আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এক সময় নিজের গাড়ি থাকলেও মকবুল হোসেন এখন অন্যের মালিকানাধীন সিএনজি অটোরিকশা চালিয়ে নিজের জীবনের চাকা ঘুরাচ্ছেন।
প্রতিবাদী-প্রতিদ্বন্দ্বীদের ‘শায়েস্তা’ করতে রুনু মিয়ার রয়েছে ‘মামলা বাহিনী’। জানা গেছে, ২০০৫ সালের কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক ইনসান আলী ও লাইনম্যান হেলাল মিয়াকে দিয়ে অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা করিয়েছেন রুনু মিয়া। তার অপকর্মের সঙ্গী হিসেবে আরও রয়েছেন তামাবিল উপশাখার সাবেক সভাপতি শাহাবউদ্দিন সাবু, জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক লাইনম্যান মিনহাজ উদ্দিন, ক্যাশিয়ারের পদে থাকা আরিফুল ইসলাম, জেলা শাখার সদস্য ফয়জুল। রুনু মিয়ার কমিটিকে শুরু থেকেই অবৈধ বলছেন সাধারণ শ্রমিকরা। তারা বারবারই নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসতে থাকেন। কিন্তু তাতে পাত্তাই দেননি রুনু মিয়া। এক পর্যায়ে নির্বাচনের দাবিতে প্রশাসনিক ও শ্রমিক সংগঠনের ১৭টি দপ্তরে আবেদন করেন সাধারণ শ্রমিকরা। চাপের মুখে শ্রমিকদের সাথে বসতে রাজি হন রুনু মিয়া। তবে রুনু মিয়ার ভেতরে ছিলো অন্য চিন্তা। নির্বাচন ইস্যুকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি সিলেট নগরীর ধোপাদীঘিরপার স্ট্যান্ডের সামনে রুনু মিয়া সহ তার বাহিনীর হামলার শিকার হন নির্বাচন দাবিকারী শ্রমিকরা। এ ঘটনায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা হয়। এছাড়া নির্বাচনের দাবিতে সিলেটের শ্রম আদালতেও মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘ এ সময়ে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন রুনু মিয়া। এ অভিযোগেও সিলেটের শ্রম আদালতে মামলা হয়েছে। শ্রমিকদের ভাষ্য, ১৮ বছরের কোনো টাকারই হিসাব পাননি তারা, এমনকি ইউনিয়নের নামে কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। রুনু মিয়ার পকেটই যেনো ইউনিয়নের অ্যাকাউন্ট। ইউনিয়নের নামে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করেছেন তিনি। গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করো সদস্য অন্তর্ভুক্তির নামে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেন তিনি। প্রতি বছর সদস্য নবায়নের নামে আড়াই হাজার সদস্যের কাছ থেকে আরও ১২০ টাকা করে আদায় করা হয় ইউনিয়য়নের নামে। লাইন খরচ নামে মাসে আরও ৬শ টাকা করা হয় সদস্যদের কাছ থেকে। দৈনিক চাঁদা দিতে হয় আরও ৪০ টাকা করে। নতুন গাড়ি লাইনে ঢুকাতে হলে দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। সব কিছু হিসেব নিকেশ করে শ্রমিকরা বলছেন, অন্তত ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঢুকেছে রুনু মিয়ার পকেটে।
কোথায় গেলো শ্রমিকদের টাকা? জকিগঞ্জের গ্রাম থেকে উঠে আসা রুনু মিয়া মঈনের সম্পদের দিকে তাকালে হয়তো সে হিসেব মিলতে পারে। এক সময়ের রিকশাচালক রুনু মিয়ার এখন খাদিমনগরে ৪টি প্রাসাদোপম বাড়ি আছে। আরও একটি ১২ তলা দালান উঠছে, ইতোমধ্যেই যার ৬ তলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগ গুলো প্রশ্ন আকারে তোলা হয় রুনু মিয়ার সামনে। ঘুমভাঙা কণ্ঠে বুধবার মধ্যরাতে একাত্তরের কথাকে বলেন, নির্বাচন আটকে রাখা ও টাকা আত্মসাতের দুটো অভিযোগ তার জানা আছে। আদালতে বিষয় গুলো বিচারাধীন। যদি অপরাধ করে থাকি শাস্তি পাব, অপরাধ না করলে নির্দোষ প্রমাণিত হব। সাথে এটাও যোগ করলেন অভিযোগকারীরা ইউনিয়নের সাথেই যুক্ত নন। নির্বাচন প্রশ্নে তার জবাব অনেকটাই ‘ডিপ্লোমেটিক’। কেউ যদি নির্বাচন করতে না চায় তাকে তো আর ঘর থেকে নিয়ে আসা যায় না। অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তার সাফ জবাব, এত টাকা কোত্থেকে আসবে। অভিযোগকারীরা নিজেদের মতো হিসেব তৈরি করে নিয়েছেন। নিজের সম্পদের ব্যাপারে বললেন, জায়গা-জমির ব্যবসা করি সম্পত্তি হতেই পারে। আল্লাহ চাইলে যে কাউকে সম্পত্তি দিতে পারেন।
রুনু মিয়া নিজের সম্পর্কে সাফাই গাইলেও পরিবহন শ্রমিকদের কাছে তার একটা বিশেষ নাম রয়েছে। সামনে কিছু বলতে না পারার দুঃখটাকে চাপা দিতে আড়ালে শ্রমিকরা তাকে ‘বোয়াল’ নামে ডাকেন। তবে অনুসন্ধান বলছে রুনু মিয়া কোনো ছোটখাট বোয়াল নন, রীতিমতো ‘রাঘব বোয়াল’। কাল হবে এমন আরও এক রাঘব বোয়ালের গল্প।
সূত্র : দৈনিক একাত্তরোর কথা


