////

চুয়াডাঙ্গায় এক মঞ্চে সংসদ নির্বাচনের সকল প্রার্থী জনগণের মুখোমুখি; দুর্নীতিমুক্ত শাসন ও জবাবদিহিতার অঙ্গীকার

34 mins read

ভোটের রাজনীতির চিরাচরিত প্রথা ভেঙ্গে ভোটারদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরাসরি জবাবদিহিতার এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বিপরীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন মুক্ত মঞ্চে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ জেলা কমিটির উদ্যোগে মুখোমুখি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ‘জনগণের মুখোমুখি’ সংলাপে এক মঞ্চে দেখা যায় তিনজন প্রার্থীকে। ২০২৬ সালের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সকল প্রার্থীরা কেবল নিজেদের ইশতেহারই তুলে ধরেননি, বরং দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী আগামীর চুয়াডাঙ্গা গড়ার ১৫ দফার এক কঠোর ‘অঙ্গীকারনামায়’ স্বাক্ষর করেছেন।
সুজন চুয়াডাঙ্গা জেলা কমিটির সভাপতি ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন সংগঠনের ডিস্ট্রিক ফ্যাসিলেটেটর সাংবাদিক মেহেরাব্বিন সানভী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দি হাঙ্গার প্রজেক্টের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী খোরশেদ আলম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর কামরুজ্জামান, প্রবীণ সাংবাদিক আজাদ মালিতা এবং সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ইকবাল আতাহার তাজসহ জেলার সুধীজন।

শীতের সকাল উপেক্ষা করে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৪৫০জনের অধিক সাধারণ ভোটার এই সংলাপে অংশ নিয়ে প্রার্থীদের কাছে তাদের প্রত্যাশা ও স্থানীয় সমস্যার কথা তুলে ধরেন।

সংলাপে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ, জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী জহুরুল ইসলাম আজিজি একই মঞ্চে বসে দীর্ঘ সময় ভোটারদের সরাসরি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এসময় প্রার্থীরা অঙ্গীকার করেন যে, তারা নির্বাচিত হলে চুয়াডাঙ্গাকে সন্ত্রাস, মাদক এবং টেন্ডারবাজমুক্ত একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুজ্জামান শরীফ তার বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গাকে একটি আধুনিক ও নিরাপদ জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন,‘আমি আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গীকার করছি, নির্বাচিত হলে চুয়াডাঙ্গাকে সন্ত্রাস, মাদক এবং চাঁদাবাজমুক্ত এলাকায় পরিণত করব। আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে চাই যেখানে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে তাদের মতামত জানাতে পারবে। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষিভিত্তিক এই অঞ্চলের কৃষকদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আমি সংসদে সোচ্চার থাকব। ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার যে নতুন ধারার রাজনীতির ডাক সুজন দিয়েছে, আমি তা সানন্দে গ্রহণ করছি।’

জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল তার বক্তব্যে সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন,‘জনগণ যদি আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করে, তবে আমি আইনসভার মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকব। স্থানীয় প্রশাসনের ওপর কোনো অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হবে না, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। এলাকার আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার প্রধান দায়িত্ব হবে। আমরা চাই একটি বৈষম্যহীন সমাজ, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার পাবে। টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো উপড়ে ফেলাই হবে আমার অন্যতম লক্ষ্য।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী জহুরুল ইসলাম আজিজি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের রাজনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ক্ষমতার জন্য নয়, বরং জনসেবার মানসিকতা নিয়ে নির্বাচনে এসেছি। নির্বাচিত হলে আমি এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ও মানোন্নয়নে কাজ করব। টেন্ডারবাজি ও দখলদারিত্বের রাজনীতিকে চুয়াডাঙ্গা থেকে চিরতরে বিদায় করতে হবে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, বিজয়ী হই বা না হই, সবসময় জনগণের পাশে থাকব এবং মুক্তিযোদ্ধাসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করব। আমাদের লক্ষ্য হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো সাধারণ মানুষ সরকারি দপ্তরে গিয়ে হয়রানির শিকার হবে না।’

অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রার্থীদের ১৫ দফার লিখিত অঙ্গীকারনামা। যেখানে প্রার্থীরা ঘোষণা করেন নির্বাচনে জয়ী হলে তারা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদের হিসাব প্রতি বছর জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন। এই অঙ্গীকারনামার মাধ্যমে তারা আরও প্রতিশ্রুতি দেন, সংসদ সদস্য হিসেবে তারা আইন প্রণয়ন ও জাতীয় নীতিনির্ধারণে মনযোগী হবেন এবং স্থানীয় সরকারের কাজে কোনো প্রকার বিধি-বহির্ভূত হস্তক্ষেপ করবেন না। স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং নিয়োগ বাণিজ্যের মতো ব্যাধি থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিও আসে প্রার্থীদের কাছ থেকে।

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিন প্রার্থীই এক সুরে বলেন,‘গণরায় যাই হোক, আমরা তা মাথা পেতে নেব। বিজয়ী প্রার্থীকে এলাকার উন্নয়নে আমরা পরাজিতরাও পূর্ণ সহযোগিতা করব।’

সুজন নেতৃবৃন্দ জানান, সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার করার যে অঙ্গীকার প্রার্থীরা দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভোটারদের সরাসরি করা প্রশ্নের জবাবে প্রার্থীরা স্বীকার করেন, উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বছরে অন্তত একবার সরাসরি জনগণের মুখোমুখি হওয়ার প্রথা তারা চালু রাখবেন। উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, চুয়াডাঙ্গার এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সংলাপ দেশের অপরাজনীতির বিপরীতে এক পশলা শান্তির বার্তা বহন করছে, যা আগামী নির্বাচনে একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version