////

জলাবদ্ধতা-যানজটের কুমিল্লায় বদলের হাওয়া, স্বপ্ন দেখাচ্ছে কুউক

39 mins read

বৃষ্টি হলেই নগরীর সড়কজুড়ে পানি, কোথাও হাঁটুসমান জল। এর সঙ্গে যোগ হয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সরু সড়ক, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রতিদিনই নাগরিক ভোগান্তিতে পড়ছেন কুমিল্লা নগরবাসী। বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতা ও যানজট যেন নগরজীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

তবে দীর্ঘদিনের এই চিত্র বদলের প্রত্যাশায় এবার নতুন করে আশাবাদী কুমিল্লার মানুষ। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন রোধ করে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক)। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং চালু হয়েছে কার্যালয়ের কার্যক্রম। ফলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর কুমিল্লার নগর উন্নয়নে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর নগরবাসীর প্রত্যাশা ছিল নাগরিক জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। সময়ের সঙ্গে নগরের পরিধি ও জনসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাও। কিন্তু নগরের মৌলিক সমস্যাগুলোর অনেকটাই এখনো রয়ে গেছে আগের মতো।

প্রায় ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কুমিল্লা নগরীতে জলাবদ্ধতা, যানজট, সংকীর্ণ সড়ক, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ড্রেনেজ সংকট এবং পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে এক এলাকায় সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য এলাকায় তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা ও যানজটের মতো সমস্যার স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

এমন বাস্তবতায় কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যাত্রাকে পরিবর্তনের সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। তাদের প্রত্যাশা, কুউকের কার্যক্রম শুধু রাস্তা কিংবা ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং আগামী কয়েক দশকের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লার সামগ্রিক নগরায়নকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে।

নগরীর মোগলটুলির বাসিন্দা ও কান্দিরপাড়ের রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সফিউল্লাহ মনি বলেন, সরকার কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করায় নগরবাসী আনন্দিত। তিনি চান, কুউকের উদ্যোগে কুমিল্লার পুরাতন গোমতী নদীকে ঢাকার হাতিরঝিলের আদলে আধুনিকায়ন করা হোক।

তার ভাষ্য, কুমিল্লা নগরবাসীর বিনোদন ও অবসর কাটানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পুরাতন গোমতীকে ঘিরে এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে নগরবাসীর হাঁটাচলা, বিনোদন ও অবসর কাটানোর পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্যও বাড়বে। একই সঙ্গে সুযোগ থাকলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আরও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

নগরীর ঝাউতলা এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, কুমিল্লা শহরে বর্তমানে অনেক উঁচু ও বড় বড় ভবন নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু এসব ভবন কতটা ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনাকে মাথায় রেখে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, নতুন ভবনের অনুমোদন দেওয়ার সময় কুউককে ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নগর পরিকল্পনায় কুউকের যাত্রাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যমকর্মীরাও।

কুমিল্লা রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি ও সারাবাংলা’র কুমিল্লা প্রতিনিধি মোঃ রাসেল বলেন, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় নগরবাসী আশাবাদী। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে দীর্ঘদিনের অনেক সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি আরো বলেন, কুমিল্লা একটি প্রাচীন শহর। অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষায় এ শহরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু শহরটি বর্তমানে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এবং অনেক সড়কই প্রয়োজনের তুলনায় সরু। তাই কীভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যায়, কোথায় সড়ক প্রশস্ত করার সুযোগ রয়েছে এবং কীভাবে যানজট কমানো যায়—এসব বিষয়কে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে কুউক কুমিল্লাবাসীকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর উপহার দিতে সক্ষম হবে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, কুউকের কার্যকর উদ্যোগে ধীরে ধীরে কুমিল্লা একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগরীর রূপ পাবে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, গুরুত্ব পাবে সড়ক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, পার্ক ও খেলার মাঠ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে হলে শুধু বর্তমান সমস্যার সমাধান করলেই হবে না। আগামী কয়েক দশকের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসন, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধার চাহিদা মাথায় রেখে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় গড়ে উঠবে বাণিজ্যিক এলাকা, কোন সড়ক ভবিষ্যতে কতটা প্রশস্ত করা সম্ভব, কোথায় থাকবে পার্ক ও খেলার মাঠ, কীভাবে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা হবে—এসব বিষয়কে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনতে হবে।

ইতোমধ্যে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে উৎবাতুল বারি আবুকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চালু হয়েছে কার্যালয়ের কার্যক্রম। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করার কথা জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।

কুউকের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারি আবু বলেন, “কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সবেমাত্র সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুর মতো। আমরা এখন লোকবল নিয়োগে কাজ করছি। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী সবাইকে নিয়ে আধুনিক, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য একটি কুমিল্লা গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ।”

তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে কুমিল্লায় যে উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণ করে শহরটিকে আধুনিক কুমিল্লা হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। কুমিল্লার সামনে এখন বড় প্রশ্ন—কুউক কি পারবে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও নগর ব্যবস্থাপনার নানা সংকটের চিত্র বদলে দিতে?

উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে। তবে নতুন এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রাকে ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। তাদের চাওয়া, কুউক যেন আর দশটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে কুমিল্লার নগরজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে।

জলাবদ্ধতা ও যানজটের দুর্ভোগ পেরিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য কুমিল্লার যে স্বপ্ন নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে দেখছেন, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাত ধরে সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেয়—এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version