////

তারেক মাসুদকে হারানোর ১৫ বছর

23 mins read

জিয়াউল হক শোভনঃ তারেক মাসুদ ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, লেখক এবং গীতিকার। মাটির ময়না (২০০২) তার প্রথম চলচ্চিত্র, যার জন্য তিনি ২০০২-এর কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।

তারেক মাসুদ পরিচালিত প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সোনার বেড়ি (১৯৮৫) এবং সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রানওয়ে (২০১০)। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে।

মাসুদ ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মশিউর রহমান মাসুদ ও তার মায়ের নাম নুরুন নাহার মাসুদ

১৯৮২ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স শেষ করে তিনি তার প্রথম প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এটি নির্মাণ করতে তার সাত বছর লেগেছিল। ১৯৮৯ সালে প্রখ্যাত বাংলাদেশী শিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের উপর আদম সুরত প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মান করেন। এরপর থেকে তিনি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি, অ্যানিমেশন এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি নির্মাণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি ভ্রাম্যমাণ গানের দলকে নিয়ে মুক্তির গান। এই প্রামাণ্যচিত্রের জন্য তিনি ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার লাভ করেন।

২০০২ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মাটির ময়না মুক্তি পায়। ছবিটি তার শৈশবের মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয়। ছবিটি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং তিনি দেশে-বিদেশে বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন। চলচ্চিত্রটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং তিনি ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট পুরস্কার লাভ করেন। এই চলচ্চিত্রের জন্য তারেক মাসুদ ২৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকারের পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও মারাকেচ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ক্যাথরিন মাসুদের সাথে যৌথভাবে তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার লাভ করেন। এটি বাংলাদেশ থেকে অস্কারের বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় মনোনয়ন দেওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র এবং প্রথম বাংলা ভাষার বাংলাদেশী চলচ্চিত্র।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র অন্তর্যাত্রা (২০০৬) দুটি প্রজন্মকে তুলে ধরেছে, যারা বাংলাদেশ থেকে লন্ডন চলে যায় এবং পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

২০১০ সালে তিনি দেশে ছড়িয়ে পরা জঙ্গিবাদ ও এর প্রভাব নিয়ে রানওয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কার লাভ করেন। তারেক মাসুদের শেষ অসম্পূর্ণ কাজ কাগজের ফুল। ছবিটি ভারত ভাগের গল্প নিয়ে করা। চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় ছিল লোকসঙ্গীত এবং লোকজ ধারা।

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ একজন মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন যার নাম অডিওভিশন। এই দম্পতির ‘মাসুদ নিশাদ’ নামে এক সন্তান রয়েছে।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট কাগজের ফুল নামের চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের লোকেশন দেখার জন্য তারেক মাসুদ তার সহকর্মীদের নিয়ে মানিকগঞ্জের সালজানা গ্রামে যান। লোকেশন নির্বাচন শেষে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে তারা গাড়িবহর নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে ঘিওরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই তারেক মাসুদ এবং তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের মৃত্যু হয়। তারেকের সাথে কাজ করা ওয়াসিম, সেট ডিজাইনার জামাল হোসেন, ও মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজও এই দুর্ঘটনায় মারা যান। গুরুতর আহত হন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ সহ আরো অনেকে।

আজ কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ’র ১৫তম প্রয়ান দিবসে বাংলা আওয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Latest from Blog

English version